আজকাল ওয়েবডেস্ক: রবিবার বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা এবং স্পেন। ম্যাচ শেষে বিজয়ী দলের অধিনায়কের হাতে উঠবে ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফি - বিশ্বকাপ। কিন্তু এই সোনালি, ঝকঝকে, আকর্ষণীয় ট্রফির উৎস, ইতিহাস বা ব্যাকগ্রাউন্ড কখনও জানার চেষ্টা করেছেন? গত ৯৬ বছর ধরে এই ট্রফি বিশ্বকাপজয়ী দলের হাতে উঠছে। এই ট্রফির নকশার নেপথ্যে রয়েছে এক ইতালীয় ভাস্করের অনন্য সৃষ্টিশীলতা এবং এক দীর্ঘ ইতিহাস। এই ট্রফির মধ্যে ক্রীড়াক্ষেত্রে তিন আবেগকে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন ভাস্কর - ফুটবলারদের সংগ্রাম, সমর্থকদের উচ্ছ্বাস এবং জয়ের মুহূর্ত।

মিলানের ব্রেরা এলাকার নিজের স্টুডিয়োতেই বিশ্বকাপ ট্রফির নকশা তৈরি করেছিলেন ইতালীয় ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগা। ১৯৭০ সালে তৃতীয়বার বিশ্বকাপ জিতে ব্রাজিল চিরস্থায়ীভাবে আগের ট্রফি নিজেদের দখলে করে নেওয়ার পর নতুন ট্রফির নকশার জন্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করে ফিফা। সেই প্রতিযোগিতায় গাজ্জানিগার নকশাই শেষপর্যন্ত নির্বাচিত হয়। তাঁর নকশায় দেখা যায়, দুটি মানবমূর্তি সর্পিলভাবে উঠে গিয়ে পৃথিবীর মতো গোলাকার একটি জিনিসকে ধরে আছে। গাজ্জানিগার ছেলে জর্জিওর কথায়, তাঁর বাবা অসংখ্য স্কেচ তৈরি করার পর এমন একটি নকশার কথা ভাবেন, যেখানে পৃথিবী এবং ডিএনএ-র মতো দুটি রেখা একসঙ্গে ফুটে উঠবে।

সিলভিও গাজ্জানিগা ২০১৬ সালে প্রয়াত হন। তিনি জিডিই বের্তোনি সংস্থায় কাজ করতেন। শুধু বিশ্বকাপ নয়, উয়েফা কাপ এবং ইউরোপিয়ান সুপার কাপের মতো একাধিক মর্যাদাপূর্ণ ট্রফিরও সৃষ্টিকর্তা তিনি। বিশ্বকাপের আগের ট্রফির ইতিহাসও কম রোমাঞ্চকর নয়। ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপের জন্য তৈরি সেই ট্রফিতে গ্রিক দেবী নাইকির প্রতিকৃতি ছিল। বিশ্বকাপের প্রতিষ্ঠাতা জুলে রিমের নামে ট্রফিটির নাম ছিল 'জুলে রিমে ট্রফি'। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে প্রদর্শনীর সময় ট্রফি চুরি হয়ে যায়। পরে 'পিকলস' নামে একটি কুকুর দক্ষিণ লন্ডনের একটি ঝোপের নীচে ট্রফিটি খুঁজে পায়। তবে ১৯৮৩ সালে ব্রাজিলের ফুটবল ফেডারেশনের সদর দফতর থেকে দ্বিতীয়বার চুরি যাওয়ার পর ট্রফিটি আর উদ্ধার হয়নি। ধারণা করা হয়, ট্রফি গলিয়ে ফেলা হয়েছে।

গাজ্জানিগার নকশায় ফুটে উঠেছে জয়। ৫০টিরও বেশি নকশা জমা পড়লেও একমাত্র গাজ্জানিগাই পূর্ণাঙ্গ মডেল তৈরি করেছিলেন। তাঁর ছেলে জর্জিও জানান, 'ট্রফির নকশায় পৃথিবীকে সব কিছুর ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছে। ফুটবলারদের শরীরের রুক্ষতা, পরিশ্রম, সংগ্রাম এবং জয়ের জন্য লড়াই ফুটে উঠেছে সেই ভাস্কর্যে। আর হাতগুলো একইসঙ্গে বিজয়ের প্রতীক এবং সমর্থকদের উচ্ছ্বাসকে তুলে ধরেছে।' বর্তমান বিশ্বকাপ ট্রফি ৩৬ সেন্টিমিটার উঁচু এবং ১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি। এর নীচের অংশে সবুজ ম্যালাকাইটের দুটি বলয় রয়েছে, যা ফুটবল মাঠের প্রতীক। তবে বিজয়ী দল আসল ট্রফিটি চিরস্থায়ীভাবে নিজেদের কাছে রাখতে পারে না। ফাইনালের পর ট্রফিটি ফিফার সুইজারল্যান্ডের সদর দফতরে ফিরে যায়। বিজয়ী দলকে দেওয়া হয় বিশ্বকাপ ট্রফির একটি রেপ্লিকা।

ব্রাজিল তিনবার বিশ্বকাপ জেতার পর আগের ট্রফি পাকাপাকিভাবে নিজেদের করে নিয়েছিল। তবে ফিফা এখন আর তিনবারের চ্যাম্পিয়নদের আসল ট্রফি দিয়ে দেয় না। ২০২৬ বিশ্বকাপ সহ এখনও পর্যন্ত ১৪টি বিশ্বকাপে গাজ্জানিগার নকশার ট্রফিই ব্যবহার করা হয়েছে। ফিফা অন্তত ২০৩৮ সালের বিশ্বকাপ পর্যন্ত এই ট্রফি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১৯৭৪ সালে পশ্চিম জার্মানি এবং নেদারল্যান্ডসের বিশ্বকাপ ফাইনাল টেলিভিশনে পরিবারের সঙ্গে দেখেছিলেন জর্জিও গাজ্জানিগা। সেটাই ছিল তাঁর বাবার তৈরি ট্রফি বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রথমবার তুলে ধরার মুহূর্ত। তবে তাঁর মতে, আসল বিস্ফোরণ ঘটেছিল যখন মিউনিখে জার্মান দল ট্রফিটি তুলে ধরে এবং গোটা স্টেডিয়াম আনন্দে ফেটে পড়ে। তাঁর কথায়, 'সেই মুহূর্তেই একটি বস্তু আইকনে পরিণত হয়।'