কৃশানু মজুমদার: ভারত বনাম ইতালির মধ্যে ক্রিকেট ম্যাচ হলে তিনি ধর্মসঙ্কটে পড়ে যাবেন। 
একদিকে নিজের দেশ ভারত। যেখানে তিনি বেড়ে উঠেছেন। অন্যদিকে মাতৃসমা ইতালি। যে দেশ তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। 

বনহুগলির বিপ্লব দেবনাথ দোটানায় পড়ে বলতে থাকেন, ''২৬ বছর ইতালিতে রয়েছি। ইতালি আমার কাছে মাতৃসমা। ইতালি হেরে গেলে মন খারাপ হয়ে যায়। আর আমার দেশের সম্পর্কে কেউ কিছু খারাপ বললে আমি বাঘ হয়ে যাই। খেলার মাঠে ভারত বনাম ইতালি ম্যাচ হলে আমি দোলাচলে ভুগব।'' 

সেই ইতালি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আজ হেরে গিয়েছে স্কটল্যান্ডের কাছে। 
প্রথমে ব্যাট করে স্কটিশরা তুলেছিল ৪ উইকেটে ২০৭ রান। রান তাড়া করতে নেমে ইতালি শেষ হয়ে যায় ১৩৪ রানে। কলকাতার ইডেন উদ্যানে ৭৩ রানে জয় ছিনিয়ে নেয় স্কটল্যান্ড। 

বিপ্লব বলছেন, ''আজ যদি কলকাতায় থাকতাম তাহলে তো ম্যাচটা ইডেনে বসেই দেখতাম। ইতালির পতাকা নিয়ে চলে যেতাম। গলা ফাটাতাম ইতালির জন্য।'' 

তার বদলে বঙ্গসন্তান এদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই টিভির পর্দায় চোখ রেখেছিলেন। ইতালি হেরে যাওয়ায় মন খারাপ তাঁর। মিলানের রাস্তায় গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে বলছিলেন, ''একটা সময় পর্যন্ত লড়াইয়ে ছিল ইতালি। কিন্তু দ্রুত  উইকেট হারিয়ে ম্যাচটা হেরে গেল।'' 
ইতালি যে ক্রিকেট বিশ্বকাপে নেমে পড়েছে, তা সে দেশে অনেকেই জানেন না। খেলাটা নিয়ে সেভাবে উৎসাহও নেই। তবে বিপ্লব আশাবাদী আগামী পাঁচ বছরে ক্রিকেটে আরও উন্নতি করবে ইতালি।  
ডানলপের কাছে বনহুগলি থেকে উত্তর ইতালির মন্টেবেলুনা। সেই ২০০০ সালে দেশ ছেড়ে পাড়ি দেওয়া ভিনদেশে। সেখানেই কালক্রমে তিনি হয়ে ওঠেন ফ্লাওয়ার ডিজাইনার। এখন তাঁর বিশাল কর্মযজ্ঞ। পরভূম তাঁর কাছে হয়ে ওঠে বড় আপন। হৃদয়ের খুব কাছাকাছি সে দেশ। ইতালির সুখ-দুঃখ মন ছুঁয়ে যায় বঙ্গতনয়ের। তিনি বলছেন, ''আমি আসলে রবার্তো বাজ্জিওর বড় ভক্ত। তখন বাজ্জিও জুভেন্টাসে ছিলেন। আমিও জুভেন্টাসের সমর্থক হয়ে যাই। এখন আমার অনেক বন্ধুরা মিলানের সাপোর্টার, আমিও মিলানেরই সমর্থক হয়ে গিয়েছি। তবে মন থেকে নয়।'' 

মনের দিক থেকে তিনি এখনও ইস্টবেঙ্গলের অন্ধ ভক্ত। দূরে বসেও ইস্টবেঙ্গলের খবরাখবর রাখেন। কলকাতায় এসে মাঠে বসে লাল-হলুদের খেলা দেখতে চান। ইস্টবেঙ্গল জিতলে মন ভাল হয়ে যায়। আবার হেরে গেলে মনে জমে মেঘ। 

কপিলদেব নিখাঞ্জ ছিলেন প্রিয় ক্রিকেটার। তৎপরবর্তীতে তাঁর মনপ্রাণ জুড়ে শুধুই শচীন তেণ্ডুলকর। এখনও 'মাস্টার ব্লাস্টার' তাঁর কাছে প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ। বিপ্লব বলছেন, ''নিউ জিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারতের শেষ ম্যাচটা আমি দেখেছিলাম। সেই ম্যাচ দেখে মনে হয়েছে বিশ্বের যে কোনও দলকে আমরা গুঁড়িয়ে দিতে পারি। কিন্তু আমেরিকার সঙ্গে প্রথম ম্যাচে একসময়ে ৭৭ রানে ৬ উইকেট চলে গিয়েছিল। সেই ম্যাচটা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, ভারত যা ছিল, তাই রয়ে গিয়েছে।'' কোনওদিন আসমানে তো পরদিনই জমিতে। 
 
লকডাউনের সময়ে ইতালির একাকী বয়স্কদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বঙ্গসন্তান পেয়েছিলেন সরকারি স্বীকৃতি। ব্যস্ততার মধ্যেই তাঁর দিন কেটে যায়। চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী, ''প্রথম ম্যাচে যতই ঘাম ঝরিয়ে ভারত জিতুক না কেন, কাপ জিতবে ভারতই। মাই ইন্ডিয়া ইজ দ্য বেস্ট।'' 

তাঁর কন্যা ভেনিস বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকের পাঠ নিচ্ছেন। অলস কোনও বিকেলে বিপ্লবের হৃদয়ে সুর তোলে ঘরে ফেরার গান। মায়ের কাছে ফিরতে চান তিনি। কিন্তু ফিরব বললেই কি ফেরা যায়? বিপ্লব বলছেন, ''গতবছরও কলকাতা গিয়েছিলাম। আরও দশ বছর আমাকে এখানে থাকতে হবে। তার পরে হয়তো বা...।'' 

কলকাতা থেকে বহুদূরে, ইতালির রোদে দাঁড়িয়ে থাকলেও, গঙ্গার হাওয়া ভিজিয়ে দেয় তাঁর মনপ্রাণ। 
মন্টেবেলুনার সকালে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপে চুমুক দিলেও, বুকের ভিতরে ঝড় তোলে সন্ধ্যার ট্রাম, বইপাড়া আর আলোর রোশনাই। ভাষা বদলায়, সময় বদলায়, শহর বদলালেও বিপ্লবের স্বপ্নগুলো আজও কিন্তু বাংলাতেই কথা বলে। তাঁর মন পড়ে থাকে এই বাংলাতেই।