আজকাল ওয়েবডেস্ক: আইপিএলের প্রথম সংস্করণ থেকে উনিশতম অধ্যায়, সময়ের স্রোতে বদলেছে ক্রিকেট, বদলেছে টি-টোয়েন্টির সংজ্ঞা, বদলেছে ব্যাটিংয়ের গতি ও কৌশল। কিন্তু একটি জিনিস অপরিবর্তিত থেকে গিয়েছে। আর সেটা হল বিরাট কোহলি।

সেই একই রানের খিদে, একই ক্ষিপ্রতা, একই আবেগ। কেরিয়ারের শেষ প্রান্তে পৌঁছেও তিনি যেন আগের মতোই দলের ভরসা, আগের মতোই ‘চেজমাস্টার’। ফাইনালে তাঁর ব্যাট থেকে এল ৭৫ রান। ছক্কা হাঁকিয়ে ফাইনাল জেতালেন তিনি। ১২ বল বাকি থাকতে ৫ উইকেটে ম্যাচ জিতে নিল আরসিবি। গ্যালারির গর্জন বুঝিয়ে দিচ্ছিল রাজা চিরকাল রাজাই থাকে। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও কোহলি সেই বিরাট রাজা। 

গতবার আইপিএল জিতে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়েছিল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু। এবার নিজেদের সাফল্যের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে টানা দ্বিতীয়বার শিরোপা জিতল। আর সেই সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একজনই। বিরাট কোহলি। 

নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামের গমগমে ফাইনাল মঞ্চে মুখোমুখি হয়েছিল কোহলির বেঙ্গালুরু এবং শুভমন গিলের গুজরাট টাইটান্স। টস জিতে প্রথমে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন আরসিবি অধিনায়ক রজত পাতিদার। প্রথম কোয়ালিফায়ারের জয়ী একাদশেই আস্থা রাখে বেঙ্গালুরু। অন্যদিকে গিল জানান, টস জিতলেও তিনিও আগে ব্যাট করতেই চাইতেন।

কিন্তু ব্যাট হাতে শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায় গুজরাট। রাজস্থানের বিরুদ্ধে সেঞ্চুরি করে দলকে ফাইনালে তোলা গিল এদিন থামেন মাত্র ১০ রানে। তাঁর ওপেনিং সঙ্গী সাই সুদর্শনও ব্যর্থ হন, করেন মাত্র ১২ রান। আরসিবির শৃঙ্খলাবদ্ধ ও আক্রমণাত্মক বোলিংয়ের সামনে একের পর এক উইকেট হারাতে থাকে গুজরাট। নিশান্ত সিন্ধুর ব্যাট থেকে আসে ২০ রান, আর দলের অন্যতম বড় ভরসা জস বাটলার ফেরেন ১৯ রান করেই।

শেষ পর্যন্ত গুজরাটের সংগ্রহ দাঁড়ায় ১৫৫। সেই স্কোরটাকে লড়াইয়ের জায়গায় পৌঁছে দেন মূলত ওয়াশিংটন সুন্দর। যিনি অপরাজিত থাকেন ৫০ রানে।

১৫৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে দুরন্ত সূচনা করে বেঙ্গালুরু। ভেঙ্কটেশ আইয়ার ও বিরাট কোহলির জুটি শুরু থেকেই গুজরাটের বোলারদের চাপে রাখে। ১৬ বলে ৩২ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলে ভেঙ্কটেশ ফিরলে দলের রান ছিল ৬২। এরপর দেবদত্ত পাড়িক্কল মাত্র ১ রান করে আউট হন।

ম্যাচে নাটকীয় মোড় আনেন রশিদ খান। এক ওভারেই তিনি তুলে নেন রজত পাতিদার ও ক্রনাল পাণ্ডিয়ার উইকেট। গুজরাট তখন ম্যাচে ফেরার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। কিন্তু যে দলে বিরাট কোহলি থাকেন, সেই দলের বিরুদ্ধে ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছুই নিশ্চিত নয়।

কোহলি নিজের স্বভাবসিদ্ধ ধৈর্য, পরিণতিবোধ এবং দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে ইনিংসকে এগিয়ে নিয়ে যান। তাঁর পাশে ছিলেন টিম ডেভিড। ডেভিড ফেরেন ২৪ রানে। কিন্তু আরসিবির অন্যপ্রান্তে যে ছিলেন কোহলি। 
ক্রিকেটের রূপ বদলেছে, টি-টোয়েন্টি আরও দ্রুত, আরও আক্রমণাত্মক হয়েছে। কিন্তু বিরাট কোহলি যেন সময়কে হার মানিয়ে একই রয়ে গেছেন। সেই আবেগ, সেই দায়বদ্ধতা, সেই জয়ের ক্ষুধা। বহু বছর ধরে যে আরসিবির আইপিএল-খরা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সমালোচনা হয়েছে, সেই বেঙ্গালুরু এখন টানা দু'বারের চ্যাম্পিয়ন।

 ক্রিকেটের একনিষ্ঠ ছাত্র তিনি এখনও। বয়স, অভিজ্ঞতা কিংবা সাফল্যের পাহাড়, কোনও কিছুই তাঁর পর্যবেক্ষণের তীক্ষ্ণতাকে ভোঁতা করতে পারেনি। ইনিংসের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে শরীর ছুড়ে দুর্দান্ত একটি ক্যাচ ধরেছিলেন গুজরাট অধিনায়ক শুভমন গিল। প্রথম দেখায় মনে হয়েছিল, ক্যাচটি ঠিকঠাকই নিয়েছেন তিনি। গিলও আত্মবিশ্বাসী ছিলেন নিজের প্রচেষ্টায়।

কিন্তু বিরাট কোহলির চোখ বলছিল অন্য কথা। তাঁর মনে হয়েছিল, বলটি মাটিতে স্পর্শ করেছিল। তৃতীয় আম্পায়ারের কাছে পাঠানো হল সিদ্ধান্তের জন্য। রিপ্লেতে ধরা পড়ে সূক্ষ্ম সেই মুহূর্ত। বল সত্যিই মাটি ছুঁয়েছিল। অর্থাৎ কোহলির সন্দেহই ছিল সঠিক।

জায়ান্ট স্ক্রিনে ‘নট আউট’ ভেসে উঠতেই দু’হাত শূন্যে ছুড়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন কোহলি। শুধু বেঁচে যাওয়ার আনন্দ নয়, সেই মুহূর্ত যেন আরও একবার মনে করিয়ে দিল, ক্রিকেটের প্রতি তাঁর মনোযোগ, খুঁটিনাটির প্রতি তাঁর নজর এবং খেলার প্রতি তাঁর অগাধ নিবেদন আজও এতটুকু কমেনি। 

আরসিবির এই সাফল্যের মধ্য দিয়ে অধিনায়ক রজত পাতিদারও নিজের নাম লিখিয়ে ফেললেন আইপিএলের সফল অধিনায়কদের তালিকায়। এমএস ধোনি ও রোহিত শর্মাদের পাশে এবার উচ্চারিত হবে তাঁর নামও।

ফাইনালের রাত তাই শুধু আরেকটি ট্রফি জয়ের গল্প নয়। এটি বিরাট কোহলির  ধারাবাহিকতার গল্প, একটি দলের স্বপ্নপূরণের গল্প, আর এমন এক ক্রিকেটারের গল্প, যিনি উনিশটি আইপিএল পেরিয়েও প্রমাণ করে চলেছেন, কিংবদন্তিরা কখনও পুরনো হন না। তাঁরা শুধু নতুন নতুন অধ্যায় লিখে যান।