আপনি এখন শিকাগোয় আছেন। শুরু হয়ে গিয়েছে বিশ্বকাপ। শিকাগো নিশ্চয় ফুটছে? শিকাগোর মানুষজন নিশ্চয় বিশ্বকাপ জ্বরে আক্রান্ত?
উত্তর- শিকাগোয় কোনও ম্যাচ হচ্ছে না, তাই এখানে তেমন কোনও উত্তেজনা বা উৎসবের পরিবেশ নেই। আর সত্যি বলতে, এখন বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিষয় এমন ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে, সেগুলোর জন্য আগের মতো আর সেই উচ্ছ্বাস নেই। মানুষজনও এখন যা হচ্ছে, তা নিয়ে খুব একটা খুশি বলে মনে হচ্ছে না।
শিকাগোয় নাই হোক, আমি নিশ্চিত এবারের বিশ্বকাপটা খুব কাছ থেকে অনুসরণ করবেন। আপনি কোন দলকে সমর্থন করছেন এবং কেন?
উত্তর-আমি সব আরব দলকে সমর্থন করছি, বিশেষ করে মরক্কোকে। ব্রাজিলের বিরুদ্ধে কী দুর্দান্ত খেলল মরক্কো। ১৮ বছরের আয়ুব বুয়াদ্দির খেলা দুর্দান্ত লেগেছে।
এই বিশ্বকাপে এশিয়ার দলগুলোর কেমন সম্ভাবনা দেখছেন?
উত্তর-এশিয়ার কোন দলগুলোর কথা বলছেন, তার উপর নির্ভর করছে। উদাহরণ দিয়ে বলতে পারি, জাপান বহু বছর ধরে শক্তিশালী দল গড়ে তোলার কাজ করে চলেছে। আমি মনে করি এই বিশ্বকাপে জাপান বেশ ভাল পারফরম্যান্স তুলে ধরবে। দক্ষিণ কোরিয়া প্রথম ম্যাচেই ইউরোপের দেশকে হারিয়ে দিয়েছে।

মেসি, রোনাল্ডো এবং নেইমারের মধ্যে আপনার ব্যক্তিগত পছন্দের খেলোয়াড় কে? নাকি আপনি অন্য কোনও খেলোয়াড়কে আরও বেশি পছন্দ করেন?
উত্তর-সত্যি বলতে আমি এই তিনজনেরই ভক্ত। কারণ প্রত্যেকেই ফুটবলকে অনেককিছু দিয়েছে। এঁরা মাঠে থাকা মানেই আলাদা একটা রোমাঞ্চ জাগে। রোনাল্ডো পরিশ্রমী যন্ত্রের মতো, মেসি একজন প্রতিভাবান জিনিয়াস, আর নেইমার একজন জাদুকর। তাই তাঁদের মধ্যে পার্থক্য করা সত্যিই খুব কঠিন।
এবার বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ থেকে সরে এসে ইস্টবেঙ্গলের আইএসএল জয়ের প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করি। আপনি নিশ্চয়ই এখনও ঘোরের মধ্যে রয়েছেন?
উত্তর-ইস্টবেঙ্গলের আইএসএল জয় এখন অতীত হয়ে গিয়েছে। এখন নতুন লক্ষ্য ও উদ্দেশের দিকে তাকানোর সময়। আমাদের জন্য দারুণ এক মুহূর্ত ছিল এবং মুহূর্তগুলো আমার সারাজীবনের সঞ্চয়। চিরকাল আমার হৃদয়ে থেকে যাবে ইস্টবেঙ্গলের আইএসএল জয়ের স্মরণীয় মুহূর্ত। কিন্তু এখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময়। সামনেই এএফসি টুর্নামেন্ট। সেদিকে এবার মনোযোগ দেওয়ার সময় এসেছে।
ইন্টার কাশির বিরুদ্ধে 'ফাইনাল' ম্যাচে আপনার গোল ইস্টবেঙ্গলকে চ্যাম্পিয়ন করেছিল। আপনার কাছে দ্বিগুণ আনন্দের মুহূর্ত ছিল। আমি নিশ্চিত আপনি, আপনার পরিবার এবং আপনার ছোট্ট ছেলে এমন একটি মুহূর্তের জন্য অনেকদিন ধরে অপেক্ষা করছিল?
উত্তর- হ্যাঁ, এটা আমার কাছে স্পেশাল মুহূর্ত ছিল। কিন্তু শুধু আমার গোলের জন্যই ইস্টবেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, আমি এটা মানি না। তাহলে ডার্বিতে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে শেষ মিনিটে প্রভসুখান গিলের সেই দুর্দান্ত সেভের কথা কী বলবেন? ওই সেভ না হলে আমরা চ্যাম্পিয়ন হই না। বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে অ্যান্টনের গোলের কথা বলবেন না? পুরো মরশুম জুড়ে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছিল ইস্টবেঙ্গলকে চ্যাম্পিয়ন করা। আমরা সেই লক্ষ্যে সফল।
ইন্টার কাশীর বিরুদ্ধে গোল করার পর আপনি সরাসরি সমর্থকদের দিকে দৌড়তে শুরু করেন। ফেন্সে উঠে পড়েন। আপনার উদযাপন ইতিমধ্যেই আইকনিক হয়ে গিয়েছে। গোল করার পরে আপনার মাথায় কী কাজ করছিল? কেন আপনি এভাবে ভক্তদের সঙ্গে উদযাপন করলেন?
উত্তর--স্পেশাল গোল আমার কাছে। আর সেই সময়ে আমার শরীরে প্রচুর অ্যাড্রেনালিন ক্ষরিত হচ্ছিল। নিজের দেশের ভিতরেই উদ্বাস্তু হিসেবে ছিলাম আমি। গোলের পর আমি শুধু অনুভব করেছিলাম যে এই মুহূর্তটা সমর্থকদের সঙ্গে শেয়ার করে নেওয়া দরকার, কারণ আমি সেই অনুভূতিটা বুঝি। আর মজার ব্যাপার হলো, ম্যাচ শুরুর আগে দেবজিৎ এবং সৌভিকের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। কলকাতায় বাঙালিদের ইতিহাস নিয়ে কথা বলছিলাম ওদের সঙ্গে। সৌভিক-দেবজিৎ আমাকে ইস্টবেঙ্গলের ইতিহাস বলছিল। উদ্বাস্তুদের গল্প শোনাচ্ছিল। অত্যন্ত আবেগঘন সেই গল্পগুলো।
আপনি কি গোলটি আপনার বাবাকে উৎসর্গ করলেন?
উত্তর-অবশ্যই। আমার প্রতিটি সাফল্যই আমার বাবাকে উৎসর্গ করি। বাবা ছাড়া এই পৃথিবীতে আমি কিছুই নই।
আপনি ইস্টবেঙ্গলকে চ্যাম্পিয়ন হতে সাহায্য করেছেন, সমর্থকদের গর্বিত করেছেন এবং তাঁদের আনন্দে মুড়ে দিয়েছেন। নতুন মরশুমে কি আপনি ইস্টবেঙ্গলেই থাকছেন?
উত্তর- আশা করি হ্যাঁ। আমি ইস্টবেঙ্গলে থাকতেই চাই, কারণ আমি ক্লাব এবং লাল-হলুদ রঙের জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে চাই।

ইস্টবেঙ্গল এবার এএফসি প্রতিযোগিতায় কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আপনি যদি ক্লাবে থাকেন এবং আপনার সতীর্থরাও যদি থেকে যান, তাহলে এই টুর্নামেন্ট আপনাদের কাছে কতটা কঠিন বলে মনে করেন?
উত্তর- কঠিন হবে আমাদের জন্য। কুয়েতের ক্লাবগুলো সহজ প্রতিপক্ষ নয়। তবে আমি মনে করি আমাদের সুযোগ আছে, কারণ আমাদের মধ্যে লড়াইয়ের মানসিকতা রয়েছে। আর এই লড়াই, লড়াইয়ের মানসিকতা ম্যাচ জেতায়।
অনেক সমর্থক মনে করেন, আপনার জার্সিটা ইস্টবেঙ্গলের আর্কাইভে রাখা উচিত। আপনার কী মত?
উত্তর- (হাসতে হাসতে) আই থিঙ্ক ইটস টু আর্লি ফর দ্যাট। আমার মতে এখন সেই খেলোয়াড়দের সম্মান দেওয়া উচিত যারা ক্লাবের জন্য অনেক বছর ধরে সেবা করে আসছে, যেমন সৌভিক, মহেশ এবং সাউল।
আপনি যদি ইস্টবেঙ্গলে থাকেন, তাহলে নতুন মরশুমে আপনার ব্যক্তিগত এবং দলগত লক্ষ্যগুলো কী হবে?
উত্তর-নিশ্চয়ই প্রথম লক্ষ্য হবে এএফসি-র গ্রুপ পর্বে যোগ্যতা অর্জন করা। এরপর আমরা নিজেদের জন্য নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করব, কিন্তু সেগুলো ধাপে ধাপে এগোতে হবে।
মরশুম চলাকালীন এমন কোনও বিশেষ ম্যাচ বা মুহূর্ত কি ছিল, যখন আপনারা সত্যিই অনুভব করেছিলেন, এবার আমরা চ্যাম্পিয়ন হতেই পারি...
উত্তর-নিশ্চয়ই বেঙ্গালুরু ম্যাচের পরেই মনে হচ্ছিল।
ধরুন নতুন মরশুমে আপনি আর ইস্টবেঙ্গলে নেই, তাহলে লাল-হলুদ সমর্থকদের জন্য আপনি কী বার্তা দিতে চান?
উত্তর-বার্তাটি হবে, আমাদের সমর্থকরা সবসময়ে আমার হৃদয়েই থাকবে। ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের মধ্যে আমি যে ভালবাসা দেখেছি তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভবই নয়। দে ডিজার্ভ টু বি জয়ফুল। আমি ওদের সাফল্য ও আনন্দ কামনা করি।
আপনি ইস্টবেঙ্গলে একটি স্মরণীয় বছর কাটিয়েছেন। কয়েকটি শব্দে আপনি সেই যাত্রাকে কীভাবে বর্ণনা করবেন? আর আরও বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে, প্যালেস্তাইনের সেই ছোট্ট ছেলেটি এখন তাঁর জীবন এবং পথচলাকেকে কীভাবে দেখে?
উত্তর- অনেক সমস্যার কারণে এটা খুব কঠিন এবং অদ্ভুত একটি মরশুম ছিল। আমি এখন পর্যন্ত আমার জার্নি নিয়ে খুব গর্বিত। বিদেশে আরও ট্রফি জিততে পারলে ভাল লাগত, কারণ আমি বেশ কয়েকবার কাছাকাছি গিয়েও দ্বিতীয় হয়ে শেষ করেছি। তবে ২২ বছর পর ইস্টবেঙ্গলকে চ্যাম্পিয়ন করা সবচেয়ে ভাল অনুভূতির মধ্যে অন্যতম। এর চেয়ে গর্বিত হওয়া সম্ভবই নয়।















