সৌরভ গোস্বামী: ১৯৯৮ সালের জুনে ফ্রান্সের লিঁও শহরের এক উষ্ণ সন্ধ্যায় ফুটবল মাঠের বুকে এমন এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখা গিয়েছিল, যা আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সত্যিই রূপকথা বলে মনে হয়। রাজনৈতিকভাবে চরম উত্তপ্ত এবং বৈরিতায় ভরা এক বিশ্বকাপে সেবার মুখোমুখি হয়েছিল ইরান ও আমেরিকা। কিন্তু রেফারি বাঁশি বাজানোর আগে মাঠে নামার পর দেখা গেল সম্পূর্ণ এক বিপরীত চিত্র— আমেরিকার ফুটবলারদের হাতে পরম মমতায় সাদা গোলাপ উপহার দিয়ে, বুকে বুক মিলিয়ে এবং হাসিমুখে বরণ করে নিলেন ইরানের খেলোয়াড়রা। দুই দলের ২২ জন খেলোয়াড়ের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ঐতিহাসিক ছবি ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসের পাতায় এক চিরন্তন মৈত্রীর প্রতীক হয়ে রয়েছে, যেখানে বিশ্বরাজনীতির সমস্ত তিক্ততাকে মাঠের বাইরে ছুঁড়ে ফেলে জয় হয়েছিল খেলার আসল স্পিরিটের। সেদিন এক সন্ধ্যার জন্য এই ফুটবলাররা যা করে দেখিয়েছিলেন, তা দুই দেশের বড় বড় কূটনীতিক বা নীতি নির্ধারকরা বছরের পর বছর ধরে চেষ্টা করেও করে উঠতে পারেননি। কিন্তু আজ, প্রায় আঠাশ বছর পর ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে এসে সেই মৈত্রীর বাতাবরণ সম্পূর্ণ উধাও হয়ে গেছে এবং পরিস্থিতি এতটাই বদলে গেছে যে তেমন কোনও সুন্দর শুভেচ্ছার পুনরাবৃত্তি আজ আর কল্পনাও করা যায় না।
আসলে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে ইরান দল যেভাবে অংশ নিতে চলেছে, তেমন এক বারুদে ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি ১৯৯৮ সালের চরম উত্তেজনার দিনগুলোতেও কেউ ভাবেনি। বিগত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে আমেরিকা ও ইজরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর তীব্র সামরিক ও বিমান হামলা শুরু করায় দুই দেশের সম্পর্ক এখন খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। এই চরম রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতের গভীর প্রভাব এসে পড়েছে ফুটবল মাঠের ওপরও. টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার মাত্র ১০ দিন আগে, কয়েক সপ্তাহের চরম অনিশ্চয়তা শেষে মার্কিন প্রশাসন ইরানের খেলোয়াড়দের জন্য ভিসা মঞ্জুর করেছে। তবে ফুটবলাররা ভিসা পেলেও দলের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কর্মকর্তা যেমন— টিম ম্যানেজার, দুজন অ্যানালিস্ট, মিডিয়া ডিরেক্টর এবং ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের একজন প্রতিনিধিকে ভিসা দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে আমেরিকা। ফলে মাঠের বাইরে দল পরিচালনার মূল স্তম্ভগুলোই ভেঙে পড়েছে. শুধু তাই নয়, তীব্র বোমাবর্ষণ এবং নিরাপত্তার অভাবের কারণে ইরানের ফুটবল ফেডারেশন তাদের মূল বেস ক্যাম্প আমেরিকার অ্যারিজোনা রাজ্য থেকে সরিয়ে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দূরে মেক্সিকোর টিজুয়ানাতে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এমন গুঞ্জনও উঠেছিল যে, ইরানি ফুটবলারদের মরণপণ ম্যাচ খেলার দিনই আমেরিকায় ঢুকতে হবে এবং খেলা শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়তে হবে, যা নিয়ে পরে মার্কিন প্রশাসন বাধ্য হয়ে স্পষ্টীকরণ দেয়।
ভিসা বিতর্কের পর নতুন করে আরেকটি বড় সংঘাতের জায়গা তৈরি হয়েছে বিশ্বকাপের টিকিট নিয়ে। খেলা শুরুর ঠিক কয়েকদিন আগে ইরানের ফুটবল ফেডারেশন অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে ঘোষণা করেছে যে, ফিফার নিয়ম অনুযায়ী অংশগ্রহণকারী দেশ হিসেবে ইরানি সমর্থকদের জন্য বরাদ্দ থাকা ৮ শতাংশ টিকিট হঠাৎ করেই বাতিল বা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে যে সমস্ত ইরানি ফুটবল ভক্তরা নিজেদের জমানো টাকা খরচ করে বিমানের টিকিট, হোটেল এবং যাতায়াতের সমস্ত ব্যবস্থা আগেভাগেই বুক করে ফেলেছিলেন, তাঁরা এখন মাঠে ঢুকতে পারবেন কিনা তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কার মুখে পড়েছেন। ইরানের ফুটবল ফেডারেশন (FFIRI) এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সমতার নীতির পরিপন্থী এবং ফুটবলের ভেতর এক নোংরা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বলে সরাসরি দাবি করেছে। ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ফিফা, যারা সবসময় দাবি করে যে খেলা আর রাজনীতিকে এক সুতোয় বাঁধা উচিত নয়, তারা এখন এই ঘটনায় বেশ অস্বস্তিকর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ফিফা মহাসচিব ম্যাতিয়াস গ্রাফস্ট্রোম ইতিপূর্বেই মেক্সিকোতে ইরানি ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতির সঙ্গে বৈঠক করে ইরানি সমর্থকদের মাঠে উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য একটি বিকল্প ও গ্রহণযোগ্য পথ খোঁজার চেষ্টা করছেন।
১৯৯৮ সালের সেই বিশ্বকাপে ইরানের যে দলটি খেলেছিল, তারা ছিল মূলত ঘরোয়া লিগের অনভিজ্ঞ ফুটবলারদের নিয়ে গড়া। কিন্তু গত দু-তিন দশকে ইরানের ফুটবলের মান আন্তর্জাতিক স্তরে অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আজকের ইরানি ফুটবলাররা ইউরোপের প্রথম সারির নামী লিগগুলোতে নিয়মিত দাপটের সঙ্গে খেলছেন। এশিয়া মহাদেশের অন্যতম সেরা এবং শক্তিশালী দল হিসেবেই ইরান এবার মাঠে নামছে। আগামী ১৫ই জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে তারা। এরপর ২১শে জুন বেলজিয়াম এবং ২৬শে জুন সিয়াটেলে মিশরের মুখোমুখি হবে ইরানি দল। কাগজ-কলমে ইরানের পরের রাউন্ডে যাওয়ার যথেষ্ট উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকলেও, মাঠের বাইরে চলা এই তীব্র সামরিক সংঘাত ও বৈরিতার আবহে ফুটবল কতটা নিজের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারবে এবং খেলোয়াড়রা নির্বিঘ্নে খেলতে পারবেন কিনা, সেই বড় আশঙ্কাই এখন বিশ্ব ক্রীড়ামহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।















