আজকাল ওয়েবডেস্ক: ১৯৫০ সালের কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত বুকে নিয়ে দীর্ঘ এক যুগ পর ব্রাজিলে বসতে চলেছে ফুটবল বিশ্বকাপের আসর। দুনিয়াজুড়ে তখন তীব্র আর্থিক মন্দা, এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার ঝক্কিও অনেক। এমন এক কঠিন পরিস্থিতিতে ফিফা চাইল সদ্য স্বাধীন হওয়া ‘গান্ধীর দেশ’ ভারত যেন এই বিশ্বমঞ্চে অংশ নেয়। কিন্তু ইতিহাস বলছে, যোগ্যতা অর্জন করা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত শৈলেন মান্নাদের আর সাম্বা নৃত্যের দেশে পাড়ি দেওয়া হয়নি।
আজও ভারতবাসীর মধ্যে একটা প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, খালি পায়ে খেলতে চাওয়া এবং ফিফার বুট পরার নিয়মের গ্যাঁড়াকলেই নাকি আটকে গিয়েছিল ভারতের বিশ্বকাপ যাত্রা। কিন্তু সত্যিটা কি কেবলই বুট জুতো? না, এর গভীরে লুকিয়ে ছিল তৎকালীন অলিম্পিক-বিলাস এবং ফেডারেশনের চরম উদাসীনতা। সেই সময় অলিম্পিক গেমসের গরিমা ছিল আকাশছোঁয়া, আর বিশ্বকাপের কদর আজকের মতো মোটেও ছিল না। অলিম্পিককে অপেশাদার বা ‘অ্যামেচার’ টুর্নামেন্ট ধরা হতো। ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের (AIFF) বড় ভয় ছিল, বিশ্বকাপে খেললে যদি ফুটবলারদের গায়ে ‘পেশাদার’ তকমা লেগে যায়, তবে তো অলিম্পিক খেলার স্বপ্নই লাটে উঠবে! তদুপরি, ভারতের ঘরোয়া ফুটবল তখন চলত মাত্র ৭০ মিনিটের, অথচ আন্তর্জাতিক স্তরে ৯০ মিনিট খেলার মতো দম বা ফিটনেস দলের আছে কি না, তা নিয়েও কর্তাদের মনে যথেষ্ট দ্বিধা ছিল।
ব্রাজিল যাওয়ার দীর্ঘ জলপথের ক্লান্তিকর যাত্রা, খেলোয়াড়দের চোট পাওয়ার আশঙ্কা আর এক লক্ষ টাকার বিপুল খরচের অজুহাত দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেদের গুটিয়ে নেয় ভারত। অথচ ফিফা নিজেই ভারতের সমস্ত যাতায়াত খরচ বহন করতে রাজি হয়েছিল। ফেডারেশন সভাপতি মঈন-উল-হক বিবৃতি দিলেন, খবর নাকি অনেক দেরিতে এসেছে এবং প্রস্তুতির সময় নেই। এই টালবাহানা আর সিদ্ধান্তহীনতার খেসারত দিতে হলো ভারতীয় ফুটবলকে। অলিম্পিকের যে মোহে ভারত বিশ্বকাপকে পায়ে ঠেলল, তার পরিণতিও হল নির্মম। দু’বছর পর ১৯৫২ সালের হেলসিঙ্কি অলিম্পিকে যুগোস্লোভাকিয়ার কাছে ১০-১ গোলে চূর্ণ হয়ে প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল ভারতকে।
ভারতের এই নাম প্রত্যাহারের ফলে ১৯৫০ সালের সেই বিশ্বকাপ এক অদ্ভুত রূপ নেয়। ১৬ দলের বদলে টুর্নামেন্টটি মাঠে গড়ায় মাত্র ১৩টি দল নিয়ে। এমনকি একটি গ্রুপে তো মাত্র দুটি দল—উরুগুয়ে আর বলিভিয়াকে খেলতে হয়েছিল। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, ফুটবল ইতিহাসের এটিই একমাত্র বিশ্বকাপ যেখানে কোনো প্রথাগত ‘ফাইনাল ম্যাচ’ হয়নি। নকআউটের বদলে চার গ্রুপের সেরা চার দলকে নিয়ে হয়েছিল একটি রাউন্ড রবিন লিগ, আর সেখানেই ব্রাজিলকে স্তব্ধ করে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয় উরুগুয়ে।
আজও প্রতি চার বছর অন্তর বাঙালি সহ আপামর ভারতবাসী ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে জড়িয়ে মেতে ওঠে বিশ্বফুটবলের উন্মাদনায়। কিন্তু ফুটবল রোমান্টিকদের মনে একটা আক্ষেপ চিরকালই থেকে যায়—কর্তাদের সেইদিনের একগুঁয়েমি আর দূরদর্শিতার অভাব যদি ইতিহাসটাকে বদলে না দিত, তবে হয়তো আজ ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের তলানিতে না থেকে বিশ্বফুটবলের মানচিত্রে ভারতের গল্পটা অন্যরকম হতে পারত!
















