উদ্দালক
ওদিকে যুদ্ধ হচ্ছে। এদিকেও হচ্ছে। কিন্তু যে অনন্ত যুদ্ধে মানুষ আমৃত্যু জড়িয়ে থাকে, তার থেকে মুক্তি কোথায়। কোথায় শেষ সেই সাফল্য, যারপর বেহস্ত দেখতে পাওয়া যায়? কেপ ভার্দের ভোজিনহা তেকাঠির সামনে লাফিয়ে যেন ছুঁয়ে এলেন সেই রঙিন বেহস্তের দরজা। যার ফাঁক দিয়ে দেখা গেল অনন্ত নক্ষত্ররাজির আলো, ছায়াপথের ঝিকিমিকি যেন ছুঁয়ে গেল তাঁর মুখ-কপাল বেয়ে চুঁইয়ে পড়া ঘামে। পৃথিবীতে চল্লিশ বসন্ত পেরিয়ে এসে যেন তিনি জন্ম নিলেন, যে জন্ম অনন্ত, যে জন্মকে কোনওদিন ছুঁতে পারবে না মৃত্যু। এমনও হয়, এমন রূপকথার মতো এখনও এ পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় কোনও 'লাস্ট বেঞ্চার'? যাঁদের পৃথিবীতে হেরে যাওয়ার কথা, যাঁদের মাথা নীচু করে হারিয়ে যাওয়ার কথা বসন্তের ঝরাপাতার বনে, যাঁদের হাল ছেড়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে নিজেকেই বলার কথা, 'আর পারছি না!' তাঁদের মতো সকলের জন্য একরাতের স্বপ্নে সাদা ঘোড়া হয়ে অনন্তে মিশে গেলেন তিনি। কালচক্রে তিনি হারিয়ে যাবেন হয়ত দ্রুত, তবু, একটা দিন, এই একটা দিন তাঁর জন্য হাল ছেড়ে দেওয়া মানুষেরা মুহূর্তের জন্য ভাবতে পারল, আর একবার চেষ্টা করা যাক না! সমস্ত হেরে যাওয়া জীবনের জন্য নিষিদ্ধ ইস্তাহার লিখে গেলেন এই অখ্যাত গোলকিপার, যাঁর বাজারি মূল্য ভারতের দুই বড় ক্লাবের এক-এক গোলকিপারের অর্ধেকের-অর্ধেক!
অসম্ভব শক্তিশালী স্পেনের একাদশ। খেলা শুরুর আগে সকার দুনিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রে ছিল একটিই খবর, লামিন ইয়ামাল চূড়ান্ত একাদশে থাকবেন কী না! এমন পরিস্থিতি তৈরি করলেন কেপ ভার্দের খেলোয়াড়রা যে শেষ ১৫ মিনিট দলের সম্পদকে আহত অবস্থায় নামাতে হল মাঠে, প্রথম ম্যাচেই। এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদার স্পেন। তাঁদের বুলডোজারের সামনে এভাবে চওড়া বুকে দাঁড়িয়ে যাবেন আফ্রিকার দ্বীপরাষ্ট্রের খেলোয়াড়রা, তা বোধহয় ঠাওর করতে পারেনি দুর্ধর্ষ যুদ্ধবাজ জাতের ফুটবল-চিন্তকরা। সেই কারণেই হালকা চালে খেলা শুরু করে শেষে ঘাম ছুটে গিয়েছে তাঁদের। মাঠজুড়ে দৌড়েও পাঁচিলের মতো দাঁড়িয়ে থাকা কেপ ভার্দের ভোজিনাহর বেড়া টপকাতে পারেনি স্পেনীয়দের কোনও শট। শেষ পর্যন্ত আটকে গিয়েছে চুম্বকের মতো। খেলা শেষের পর থেকেই তাই এই ম্যাচটিকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চমক বলে তকমা দিচ্ছেন বিশ্বের তাবড় ফুটবলিয়েরা। কারণ, হেরোদের এমন গা-ঝাড়া দেওয়া লড়াই, ছোট, অপ্রাসঙ্গিক, দেশের এমন নাছো়ড় যুদ্ধ, বহুদিন পর দেখছে ফুটবলবিশ্ব।
একবার নয়, সোমবার বারবার দেশের পতন রোধ করেছেন ভোজিনহা। বয়স চল্লিশ ছুঁয়েছে। এবারটাই তাঁর প্রথম এবং শেষ বিশ্বকাপ। সেখানেই হ্যালির ধূমকেতুর মতো উঠে এলেন তিনি। শোনা যাচ্ছে, তিনি এবারের বিশ্বকাপে খেলতে চাননি। বলেছিলেন, বয়স হয়েছে, এবার নতুন কাউকে জায়গা ছেড়ে দিতে চান। কিন্তু সতীর্থরা ছাড়েননি। তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন থাকতে। তিনিও মন জড়়ো করে তাই লড়াইয়ে থেকে যান তিনি। খবর মিলছে, অদ্ভুত ভাবে এই দেশের ফুটবল দল তৈরি হয়েছে। বর্তমানের বেশিরভাগ খেলোয়াড় ছিলেন প্রবাসী। কেপ ভার্দের ফুটবল দল তৈরির জন্য উপযুক্ত খেলোয়াড় খুঁজছিল কর্তৃপক্ষ। সেই কারণে কোচ নাকি পোস্টও করেছিলেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেই সোশ্যাল বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেই অনেক প্রবাসী খেলোয়াড় যোগাযোগ করেন, পরবর্তীতে তাঁদের মধ্যে থেকে বেছে তৈরি করা হয় দল। এই দ্বীপটি আবিস্কার করেছিলেন পর্তুগিজ নাবিকরা। তারপর থেকে সেখানে উপনিবেশ তৈরি করেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর পূর্বপুরুষরা। এরপর ১৯৭৩ সাল নাগাদ এই দেশটি স্বাধীন হয়, আর সেই কারণেই পর্তুগালের সঙ্গে এই দেশের যোগ সুপ্রাচীন। বলা হয় রোনাল্ডোর কোনও এক পূর্বপুরুষ নাকি এই দেশে থাকতেন। তা সে যাই হোক, এই আগ্নেয়গিরির দেশের জনসংখ্যা কুড়িয়ে-কাঁচিয়ে হয়ত ছ'লাখ! আর সেই দেশ প্রথমবারের জন্য ফুটবল বিশ্বকাপে স্থান পাওয়ার জন্য স্বাভাবিক ভাবে উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। কিন্তু খেলোয়াড়ের অভাব তৈরি হওয়ায় বাইরের অনেক দেশ থেকে প্রবাসীদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াও শুরু হয়। শুধু এই তালিকায় ছিলেন না ভোজিনহা। তিনি যেন সেই প্রাচীন বটবৃক্ষের মতো। আগাগোড়া লড়াইয়ে ছিলেন, নিজের দেশ ছেড়ে যাননি উন্নতির তাগিদে, খেলেছেন অনামি ক্লাবে, শুধুমাত্র অপেক্ষা করেছেন, বাঘের মতো, কবে সুযোগ পাবেন। তাঁর ৪০ বসন্ত পেরিয়ে এসে তাঁর চোখে-মুখে আবেগ আর প্রতিজ্ঞার স্ট্যাম্প যেন কেউ গালা দিয়ে সেঁটে দিয়েছে। যা বারবার উন্মিলিত হয়েছে সোমবার, সকলের সামনে।
আগ্নেয়গিরির দেশের গোলরক্ষক তাই আলাদা। তাই তিনি অনন্য। একদিনের জন্য হলেও অনন্য। একদিনের জন্য হলেও তিনি সেই সমস্ত উদ্বাস্তুদের প্রতিনিধি, যাঁরা অপেক্ষা করছেন নো ম্যানস ল্যান্ডে। তিনি প্রতিনিধি ইউরোপ পেরিয়ে আসা হেরে যাওয়া সেই সমস্ত জনজাতির, ভাগ্যের সন্ধানে যাঁদের সাগর, পাহাড় পেরিয়ে আসতে আসতেই মৃত্যু হয়েছে। স্বর্গের দরজা ছুঁয়ে আসা ভোজিনাহ তাই কবিও বটে। যাঁর বাঁ-দিক, ডানদিকের লাফ, স্পট জাম্পের অনাবিল তুলির টান তাঁকে করে তুলেছে নক্ষত্র শিকারী। এই আকালেও তাই স্বপ্ন দেখা ভোজিনহাকে বলতে ইচ্ছা করে...
‘এবার তোমাকে নিয়ে যাবো আমি নক্ষত্র-খামারে নবান্নের দিন
পৃথিবীর সমস্ত রঙিন
পর্দাগুলি নিয়ে যাবো, নিয়ে যাবো শেফালির চারা
গোলাবাড়ি থেকে কিছু দূরে রবে সূর্যমুখী পাড়া
এবার তোমাকে নিয়ে যাবো আমি নক্ষত্র- খামারে নবান্নের দিন’।
- শক্তি চট্টোপাধ্যায়, অনন্ত কুয়ার জলে চাঁদ পড়ে আছে















