গণপরিবহনে, বিশেষ করে লোকাল ট্রেনে যাতায়াতের সময় পুরুষদের ভিড় এবং হেনস্থা এড়াতে অধিকাংশ মহিলাই ‘লেডিস স্পেশাল’ অর্থাৎ ট্রেনের মহিলা কামরাকে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা মনে করেন। কিন্তু সেই সুরক্ষার ভরসাটাই যদি নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়? আর তা যদি হয় মেয়েদের হাত ধরেই? সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি চাঞ্চল্যকর ভিডিও নতুন করে ট্রেনের ভেতরে নারীদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়ে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিয়েছে। যেখানে দুই তরুণী অভিযোগ করেছেন— খোদ মহিলা কামরার ভেতরেই সহযাত্রী মহিলারা ওঁদের অজান্তে ও অনুমতি ছাড়া ‘গোপনে’ ক্যামেরা চালাচ্ছিলেন!
এক্স-এ পোস্ট করা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি অত্যন্ত ভিড়ে ঠাসা লোকাল ট্রেনের মহিলা কামরায় এই ঘটনাটি ঘটেছে। তবে ট্রেনের রুট বা সঠিক লোকেশন এখনও জানা যায়নি।
ভিডিওর বিবরণ অনুযায়ী, দুই তরুণী লোকাল ট্রেনের মহিলা কামরায় উঠেছিলেন একটু নিশ্চিন্তে যাতায়াত করবেন বলে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই ওঁরদের নজরে আসে, ট্রেনের মেঝেতে বসে থাকা দুই মহিলা ওঁরদের দিকে ফোন তাক করে আছেন। ভাল করে খেয়াল করতেই ওঁরদের পায়ের তলা দিয়ে ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যায়। অভিযোগ, ওই মহিলারা তরুণীদের কোনও সাধারণ ছবি তুলছিলেন না; বরং ওঁদের শরীরের সংবেদনশীল অংশ যেমন বুক, কোমর এবং স্কার্টের নীচের অংশের ক্লোজ-আপ অর্থাৎ বড় করে ছবি ও ভিডিও ক্যামেরাবন্দি করছিলেন! যা একপ্রকার বিকৃত কামনাসুলভ হেনস্থা (Voyeurism)।
হাতেনাতে ধরা পড়ার পর যখন ওই তরুণীরা প্রতিবাদ করেন এবং মোবাইল চেক করতে বলেন, তখন অভিযুক্ত মহিলারা চরম অভদ্রতা শুরু করেন। ভিডিও রেকর্ড করতে করতে এক তরুণীকে বলতে শোনা যায়— “আপনারা জেনে রাখুন, এই মহিলা ওর দুটো ছবি তুলেছে এবং একটা ছবি কোনওভাবেই ডিলিট করতে চাইছে না। ম্যাডাম, এটা ভীষণ অন্যায়। আপনি কারও অনুমতি ছাড়া এভাবে ওঁর ছবি তুলতে পারেন না।”
সবচেয়ে হাড়হিম করা বিষয় হল, অপরাধ স্বীকার বা লজ্জিত হওয়া তো দূর অস্ত, ধরা পড়ে যাওয়ার পর অভিযুক্তা অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে ওঁর ফোন থেকে স্রেফ একটি ছবি ডিলিট করেন এবং পাল্টা আবদার করে বসেন— “যদি একটা ছবি (ফোনে) রেখে দিই, তবে কী ক্ষতি?” অবাক করার বিষয়, এই ঘটনায় ওই দুই তরুণী চরম মানসিক হেনস্থার শিকার হন। কিন্তু ভিডিওর চেয়েও বেশি বেদনাদায়ক বিষয় হল, ওই কামরায় উপস্থিত অন্য কোনো মহিলা যাত্রী কিন্তু ওই অসহায় তরুণী দুটির পাশে এসে দাঁড়াননি বা অভিযুক্তদের একটা কথাও বলেননি। চারপাশের এমন চরম উদাসীনতা এবং নিজের কামরাতেই নিজেকে অসুরক্ষিত মনে হওয়ায়, পরের স্টেশন আসতেই ওই দুই তরুণী ট্রেন থেকে নেমে যান।
ভিডিওটি ভাইরাল হতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় কমেন্টের বন্যা বয়ে গেছে। লিঙ্গ নির্বিশেষে এই ধরণের ‘ক্রিপি’ অর্থাৎ নোংরা মানসিকতার তীব্র নিন্দা করছেন নেটিজেনরা।
এক নেটিজেন তো ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন: “সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হল, ওই মেয়েরা স্রেফ সুরক্ষিত বোধ করবে বলেই মহিলা কামরা বেছে নিয়েছিল। সেখানেই এই দশা!”অন্য একজন আইনি পদক্ষেপের দাবি তুলে লিখেছেন: “ওঁর বিরুদ্ধে তখনই পুলিশি অ্যাকশন নেওয়া উচিত ছিল, যাতে আর কোনওদিন ওঁর এই সাহস না হয়। পুরুষ হোক বা নারী— কারও অনুমতি ছাড়া ছবি তোলার অধিকার কারও নেই।” ময়দানের চাবুক মন্তব্যের স্টাইলে একজন লিখেছেন: “ভারতে লড়াইটা আসলে পুরুষ বনাম নারী নয়। লড়াইটা হল সভ্য বনাম অসভ্যদের । এই মেয়েগুলো ওঁরদের পুরুষ বন্ধুদের মাঝে হয়তো ২০০% বেশি নিরাপদ থাকত, এই ধরণের বিকৃত মানসিকতার মহিলাদের চেয়ে।”
যথারীতি এই ঘটনাতেও একদল নীতিপুলিশ ভিকটিম ব্লেমিং করতে ছাড়েনি। তরুণীদের পোশাক নিয়ে কুরুচিকর মন্তব্য করে একজন লেখে— “পাবলিক প্লেসে এমন পোশাক পরলে মানুষ ছবি তুলবেই। ওটা প্রাইভেট স্পেস নয়, যা দৃশ্যমান তা ক্যামেরাবন্দি করতে কারও অনুমতির প্রয়োজন নেই।” আবার কেউ কেউ তরুণীদের ইংরেজি ভাষায় প্রতিবাদ করা নিয়ে মস্করা করে লিখেছেন, “ওই মাসি-আন্টিদের সঙ্গে ইংরেজিতে ঝগড়া করে কোনও লাভ হতো না!”
তবে ট্রোলিং যাই হোক না কেন, নারীদের হেনস্থা যে স্রেফ পুরুষরাই করে না, নারীদের একাংশের বিকৃত ও নোংরা মানসিকতাও যে অন্য নারীদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলতে পারে— এই ঘটনা তা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
















