হিন্দু ধর্মে শ্রাবণ মাস অত্যন্ত পবিত্র বলে বিবেচিত। এই মাসটি ভগবান শিবের আরাধনার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলায় শ্রাবণ মাস এলেই বহু বিবাহিত নারী শিবপুজো, সোমবারের ব্রত এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালন করেন। এই সময় অনেকের হাতে দেখা যায় নানা রঙের কাচের চুড়ি। বিশেষত সবুজ চুড়ি পরতে দেখা যায়৷ তবে কেন শ্রাবণে কাচের চুড়ি পরার রেওয়াজ রয়েছে, তা অনেকেরই অজানা।

হিন্দু শাস্ত্র ও লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, কাচের চুড়ি বিবাহিত নারীর সৌভাগ্য, সুখ ও সমৃদ্ধির প্রতীক। বিশ্বাস করা হয়, চুড়ির টুংটাং শব্দ ঘরে ইতিবাচক শক্তির সঞ্চার করে এবং অশুভ শক্তিকে দূরে রাখে। শ্রাবণ মাসে ভগবান শিব ও দেবী পার্বতীর আরাধনা করা হয়। পুরাণে বলা হয়েছে, কঠোর তপস্যার পর দেবী পার্বতী শ্রাবণ মাসেই শিবকে স্বামীরূপে লাভ করেছিলেন। সেই কারণেই বিবাহিত জীবন সুখের হোক এবং স্বামীর দীর্ঘায়ু কামনায় বহু নারী এই মাসে শিব-পার্বতীর পুজোর সময় শিবের চরণে ছোয়ানো আশীর্বাদ স্বরূপ এই সবুজ কাচের চুড়ি পরেন।

সবুজ রং নতুন জীবন, উর্বরতা, সুখ ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। আবার লাল রঙ ভালবাসা, শক্তি ও শুভত্বের প্রতীক। তাই অনেকেই শ্রাবণ মাসে সবুজ চুড়ির সঙ্গে কয়েকটা লাল চুড়িও পরতে পছন্দ করেন।

বাঙালিদের মধ্যে এই প্রথা মূলত উত্তর ভারত ও পশ্চিম ভারতের শৈব ও শক্ত উপাসনার সংস্কৃতির প্রভাবেই ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়েছে বলে ইতিহাসবিদদের ধারণা। মহারাষ্ট্র, গুজরাত, উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের বহু অঞ্চলে শ্রাবণ মাসে বিবাহিত নারীদের কাচের চুড়ি পরার রীতি বহু প্রাচীন। পরবর্তীকালে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান, পারিবারিক সম্পর্ক এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাতেও এই রেওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে।

 বর্তমানে শহর ও গ্রাম—উভয় ক্ষেত্রেই বহু বাঙালি নারী শ্রাবণ মাসে শিবপুজোর সময় কাচের চুড়ি পরেন।
তবে এটি মনে রাখা জরুরি যে, কাচের চুড়ি পরা কোনও বাধ্যতামূলক ধর্মীয় বিধান নয়। এটি মূলত একটি লোকাচার, যা বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের অংশ। কেউ কাচের চুড়ি পরুন বা না-পরুন, ভক্তিভরে শিব-পার্বতীর আরাধনাই এই মাসের মূল তাৎপর্য।
আজকের দিনে অনেক নারী ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি ঐতিহ্য ও সাজের অনুষঙ্গ হিসেবেও শ্রাবণ মাসে কাচের চুড়ি পরতে ভালোবাসেন। তাই এই ছোট্ট অলঙ্কারটি শুধু শৌখিনতার নয়, বাঙালি সমাজে বিশ্বাস, শুভেচ্ছা এবং বৈবাহিক সৌভাগ্যের এক সুন্দর প্রতীক হিসেবেও পরিচিত।