অনেক সময় আমরা বুঝতেই পারি না, আমাদের বর্তমান সম্পর্কের নানা সমস্যা আসলে শৈশবের কিছু অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িত। ছোটবেলায় পরিবার, বাবা-মা বা কাছের মানুষের কাছ থেকে আমরা যে আচরণ পাই, তা আমাদের মানসিক গঠন তৈরি করে। আর সেই অভিজ্ঞতাই বড় হয়ে প্রেম, দাম্পত্য বা অন্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, শৈশবে মানসিক অবহেলা, নিরাপত্তাহীনতা বা ভালবাসার অভাব থাকলে তার প্রভাব বহু বছর ধরে থেকে যেতে পারে। অনেকেই বড় হয়ে বুঝতে পারেন না কেন তারা সম্পর্কে বারবার একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। এর কারণ খুঁজতে গেলে অনেক সময় ফিরে তাকাতে হয় শৈশবের দিকে।


ধরুন, কোনও শিশু যদি ছোটবেলায় বাবা-মায়ের কাছ থেকে যথেষ্ট মনোযোগ বা স্নেহ না পায়, তাহলে বড় হয়ে সে সম্পর্কে অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। সঙ্গী একটু ব্যস্ত থাকলেই তার মনে হতে পারে, তাকে আর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ফলে বারবার আশ্বাস চাওয়া, অকারণে উদ্বিগ্ন হওয়া বা সম্পর্ক নিয়ে ভয় পাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।


আবার কিছু মানুষ নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন না। তারা দুঃখ, রাগ বা কষ্টের কথা মুখে বলতে অস্বস্তিবোধ করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, শৈশবে যদি তাদের আবেগকে গুরুত্ব না দেওয়া হয়ে থাকে বা 'কাঁদবে না', 'চুপ করে থাকো'-এই ধরনের কথা বারবার শুনতে হয়ে থাকে, তাহলে বড় হয়েও তারা নিজের মনের কথা লুকিয়ে রাখতে অভ্যস্ত হয়ে যান।


অনেকের মধ্যে আবার সকলকে খুশি রাখার প্রবণতা দেখা যায়। তারা নিজের ইচ্ছা বা প্রয়োজনের কথা না ভেবে সব সময় অন্যদের কথা ভাবেন। ‘না’ বলতে পারেন না। এর কারণও অনেক সময় শৈশবের অভিজ্ঞতা। ছোটবেলায় যদি ভালবাসা পাওয়ার জন্য সবসময় বাধ্য বা নিখুঁত হওয়ার চাপ থাকে, তাহলে বড় হয়েও সেই মানসিকতা থেকে যায়।


আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কিছু মানুষ বারবার অস্বাস্থ্যকর বা বিষাক্ত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। তারা এমন মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হন, যারা তাদের কষ্ট দেয় বা মানসিকভাবে অস্থির করে তোলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শৈশবে যদি তারা ঝগড়া, অশান্তি বা অনিশ্চয়তার মধ্যে বড় হয়ে থাকেন, তাহলে সেই পরিবেশকেই তারা অজান্তে স্বাভাবিক বলে মনে করতে শুরু করেন।


তবে এর অর্থ এই নয় যে শৈশবের খারাপ অভিজ্ঞতা থাকলে ভবিষ্যতের সম্পর্কও খারাপ হবে। নিজের আচরণ ও অনুভূতির কারণ বুঝতে পারলে পরিবর্তন আনা সম্ভব। প্রয়োজনে কাউন্সেলিং বা থেরাপির সাহায্য নেওয়াও উপকারী হতে পারে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ সম্পর্ক গড়তে হলে আগে নিজেকে বোঝা জরুরি। শৈশবের অভিজ্ঞতা আমাদের জীবনে প্রভাব ফেললেও, সচেতনতা ও সঠিক মানসিক চর্চার মাধ্যমে সেই প্রভাব অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। তাই সম্পর্কের সমস্যাকে শুধু বর্তমানের ঘটনা হিসেবে না দেখে, তার পেছনের কারণগুলিও বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন।