আজকাল ওয়েবডেস্ক: অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী ক্যান্সার। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগটি অনেক দেরিতে ধরা পড়ে, যখন ক্যান্সার শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে যায়। ফলে চিকিৎসার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে এবং রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও কমে যায়। তবে এবার এই মারণ রোগের বিরুদ্ধে আশার আলো দেখিয়েছেন গবেষকরা।
তাঁরা এমন একটি পরীক্ষামূলক টিকা তৈরি করেছেন, যা অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার হওয়ার আগেই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্যানসার কোষ চিনে ধ্বংস করার জন্য প্রস্তুত করে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিনটি শরীরে দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ২০ জনের মধ্যে ১৮ জনের শরীরে শক্তিশালী ইমিউন প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, যা দুই বছর পর্যন্ত সক্রিয় ছিল।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই টিকা?
এই ক্যান্সার সাধারণত হঠাৎ করে তৈরি হয় না। বছরের পর বছর ধরে অগ্ন্যাশয়ে ছোট ছোট প্রি-ক্যানসারাস পরিবর্তনের মাধ্যমে এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই ক্যান্সারের প্রায় সব ক্ষেত্রেই একটি জিন মিউটেশন থাকে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই জিনের পরিবর্তনই ক্যান্সার তৈরির অন্যতম প্রথম ধাপ। এই কারণেই গবেষকরা এই মিউটেশনকে লক্ষ্য করে টিকা তৈরি করেছেন। ভ্যাকসিনটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আগেভাগেই এই অস্বাভাবিক কোষ শনাক্ত করতে শেখায়, যাতে ভবিষ্যতে ক্যান্সার তৈরি হওয়ার আগেই সেই কোষ ধ্বংস করা সম্ভব হয়।
কীভাবে কাজ করে?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক ড. এলিজাবেথ এম. জ্যাফি এবং তাঁর দল এই ভ্যাকসিন তৈরি করেছেন। এতে জিনের সবচেয়ে সাধারণ ছয় ধরনের মিউটেশনের কৃত্রিম প্রোটিন অংশ ব্যবহার করা হয়েছে। ট্রায়ালে অংশ নেওয়া প্রত্যেককে ১৩ সপ্তাহের মধ্যে চারটি ডোজ দেওয়া হয়। এরপর রক্ত পরীক্ষা করে দেখা হয় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। ফলাফল ছিল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। শুধু তাই নয়, এই টি-সেলগুলির একটি অংশ দুই বছর পরেও শরীরে সক্রিয় অবস্থায় ছিল, যা ভবিষ্যতে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দিতে পারে।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কতটা?
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল খুবই সামান্য। ইনজেকশনের জায়গায় ব্যথা, ক্লান্তি, ঠান্ডা লাগা বা হালকা ফ্লু-জাতীয় উপসর্গ দেখা গেলেও সেগুলি অল্প সময়ের মধ্যেই সেরে যায়। কোনও গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
আরও আশাব্যঞ্জক ফল গবেষকদের নজরে এসেছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যাঁদের অগ্ন্যাশয়ে আগে থেকেই ছোট সিস্ট ছিল, তাঁদের মধ্যে অনেকের সিস্ট ছোট হয়ে যায় বা সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়। ফলো-আপ স্ক্যানে দেখা যায়, পাঁচজনের সিস্ট পুরোপুরি মিলিয়ে গেছে এবং তিনজনের ক্ষেত্রে আংশিকভাবে ছোট হয়েছে। গবেষণাকালীন সময়ে অংশগ্রহণকারীদের কারও অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার ধরা পড়েনি বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় এমন কোনও নতুন ক্ষতও তৈরি হয়নি।
গবেষকরা ইতিমধ্যেই পরবর্তী পর্যায়ের ট্রায়াল শুরু করেছেন। এবার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সিস্ট অপসারণ করতে চলেছেন এমন ব্যক্তিদের ওপর এই টিকার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। তাঁদের আশা, ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রতিরোধমূলক টিকা অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারের সমস্যায় থাকা লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য নতুন আশার দিশা দেখাবে এবং ক্যান্সারের প্রতিরোধে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
















