বাইরে থেকে দেখলে জীবন যেন স্বপ্নের মতো। খ্যাতি, সাফল্য, অর্থ, অনুরাগীর ভালবাসা, সবই রয়েছে। অথচ সেই ঝলমলে জীবনের আড়ালে লুকিয়ে গভীর একাকীত্ব, একরাশ হতাশা, মানসিক চাপ। অদৃশ্য যন্ত্রণার সঙ্গে যুজতে না পেরে হাল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। সাম্প্রতিককালে পরিচালক অনীক দত্ত হোক কিংবা সুশান্ত সিং রাজপুত, জিয়া খান অথবা ফসিলস ব্যান্ডের প্রাক্তন সদস্য বেসিস্ট চন্দ্রমৌলি বিশ্বাস সহ আরও অনেক তারকা-শিল্পী বেছে নিয়েছেন আত্মহননের পথ।

আজকাল বয়স ভেদে সমাজের সর্বত্র যেন গ্রাস করছে হতাশা! জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন সাফল্যের চূড়ায় থাকা মানুষেরাও৷ কিন্তু কেন বাড়ছে এই প্রবণতা? এবিষয়ে খুঁটিনাটি জানালেন মনস্তাত্ত্বিক সমাজকর্মী মায়াঙ্ক কুমার। 

প্রত্যাশা আর বাস্তবের ফারাক

জীবনের নানা পরিস্থিতি অনেকেই সামলে উঠতে পারেন না। প্রত্যাশা এবং বাস্তবের মধ্যে যখন বিস্তর ফারাক তৈরি হয়, তখন মানসিক চাপ বাড়তে থাকে। প্রত্যাশা হওয়া উচিত নিজের ক্ষমতা ও সম্ভাবনা অনুযায়ী। আর সেই মূল্যায়নটা খুব জরুরি। ‘SWOT Analysis’ অর্থাৎ স্ট্রেন্থ, উইকনেস, অপরচুনিটি এবং থ্রেট-এই চারটি দিক থেকে নিজের জীবন ও পরিস্থিতিকে বিচার করা প্রয়োজন। কোনটা স্ট্রেন্থ, কোনটা দুর্বলতা, কী সুযোগ এবং কী ঝুঁকি রয়েছে, তা বুঝতে পারলে পরিস্থিতি সামলানো সহজ হয়। তবে সবসময় একা তা সম্ভব নাও হতে পারে। তখন পরিবার, বন্ধুবা বা পেশাদারদের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন।

প্রতিযোগিতার যুগে বাড়ছে চাপ


বর্তমান সময়ে প্রতিযোগিতা আগের তুলনায় অনেক বেশি। কর্মক্ষেত্রে নিজেকে প্রমাণ করার চাপ, সাফল্য ধরে রাখার দায় এবং ব্যর্থতার ভয় অনেক সময় মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়। বিশেষত বিখ্যাত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও বেশি। কারণ তাঁদের প্রতিটি পদক্ষেপ, সাফল্য বা ব্যর্থতা জনসমক্ষে বিচার হয়।

পরিবার সবচেয়ে বড় ভরসা

পরিবার এবং কাছের মানুষদের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে যদি এমন কেউ থাকেন যার কাছে মনের কষ্ট বলা যায়, তাহলে অনেকটাই হালকা লাগে। তবে শুধু শোনার জন্য শোনা নয়, জাজমেন্টাল না হয়ে সহমর্মিতার সঙ্গে শোনা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা অন্যের কথা পুরোপুরি না শুনেই মতামত দিয়ে ফেলি। ফলে সমস্যায় থাকা মানুষটি আরও একা হয়ে পড়েন।

নেশা ও পারিবারিক সমস্যা

অতিরিক্ত মাদক বা নেশার ব্যবহার মানসিক অবসাদ এবং উদ্বেগ বাড়িয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি পারিবারিক অশান্তি, সম্পর্কের টানাপোড়েন বা দীর্ঘদিনের মানসিক চাপে আত্মহত্যাপ্রবণতা দেখা যায়। 

এছাড়াও শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষায় খারাপ ফল, অভিভাবকদের বকাবকি কিংবা সামাজিক লজ্জা অনেক সময় বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা, অসহনীয় যন্ত্রণা বা কঠিন রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি হতে পারে।


আত্মহত্যার আগে ইঙ্গিত

খুব কম ঘটনাতেই মানুষ কোনও পূর্বাভাস ছাড়া আত্মহত্যার পথে পা বাঁড়ান। অধিকাংশ ঘটনায় তাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কিছু সংকেত দিয়ে থাকেন। হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তি আগে যে কাজগুলো করতে ভালবাসতেন, সেগুলির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। পরিবার বা প্রিয়জনদের থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারেন। অনেক সময় দেখা যায়, যাঁর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি কথা বলতেন, তাঁর সঙ্গেই যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছেন, ঘুম বা খাওয়ার অভ্যাসে বড় পরিবর্তন, হঠাৎ করে বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে যাওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়া, আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, নেতিবাচক চিন্তা, বারবার মৃত্যু নিয়ে কথা বলা বা 'আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করছে না', 'আমাকে দিয়ে আর কিছু হবে না'— এই ধরনের মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত হতে পারে।

সাহায্য চাইতে দ্বিধা নয়

যখনই মনে হবে হতাশা বা অবসাদ ক্রমশ গ্রাস করছে, তখন দ্রুত পেশাদার সাহায্য নেওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে কেন্দ্র ও রাজ্য যৌথ উদ্যোগে রয়েছে নানা সহায়তা পরিষেবা। ১৪৪১৬-এ ফোন করলে প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায়। সেখানে গোপনীয়তা বজায় রেখে প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। আমাদের রাজ্যেও আয়ুষ্মান ভারত কর্মসূচি চালু হওয়ার প্রেক্ষিতে মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও সহজলভ্য করার বিষয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। আয়ুষ কেন্দ্রগুলির মাধ্যমে যোগব্যায়াম, ধ্যান, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন উপায়, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং সামগ্রিক সুস্থতার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা অনেকের ক্ষেত্রে মানসিক চাপ মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।

কথা বলাই প্রথম পদক্ষেপ


অনেক সময় নিজের কথা বলার জন্য কাউকে পাশে পাওয়া যায় না, আবার সকলের সঙ্গে মনের কথা বলাও যায় না। এমন পরিস্থিতিতে কোনও বিশ্বস্ত ব্যক্তি, কাউন্সেলর বা এমনকী অচেনা প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতার সঙ্গে কথা বলা লাভজনক হতে পারে।

আধ্যাত্মিক চর্চা বা ধ্যান অনেকের ক্ষেত্রে মানসিক শান্তি এনে দেয়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, নিজের কষ্টকে চেপে না রেখে তা ভাগ করে নেওয়া। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ কোনও না কোনওভাবে সাহায্যের আবেদন জানান। সেই সংকেতগুলো বুঝতে পারা এবং সময়মতো পাশে দাঁড়ানোই হতে পারে একটি জীবন বাঁচানোর অন্যতম পদক্ষেপ।