সকালে ঘুম থেকে উঠে হাতে ফোনে, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগেও স্ক্রিনে চোখ। ব্যক্তিগত হোক কিংবা পেশাগত, দিনভর অসংখ্য নোটিফিকেশন, অনবরত স্ক্রলিং আর ভার্চুয়াল জগতের খুঁটিনাটিতে বিচরণ। যা অজান্তে কখন যেন শরীর-মনের ওপর অদৃশ্য চাপ তৈরি করে চলেছে, ক্রমশ আষ্টেপৃষ্ঠে গ্রাস করছে মানবজীবন। ডিজিটাল দুনিয়ায় আপডেট থাকা এখন কাজের জগতে চাহিদাও বটে! কিন্তু প্রযুক্তি নির্ভরতা আসক্তিতে পরিণত হলেই বিপদ! তখনই প্রয়োজন ‘ডিজিটাল ডিটক্স’। কোন উপায়ে ডিজিটালের বেড়াজাল থেকে মুক্তি মিলবে? পরামর্শ দিলেন বিশিষ্ট সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ দেবাঞ্জন পান।

ডিটক্সের ধরন বুঝে ভিন্ন পদক্ষেপ 

ডিজিটাল ডিটক্স মূলত তিন ধরনের হতে পারে। সম্পূর্ণ, আংশিক ও সিলেক্টিভ। মোবাইল, কম্পিউটার, ইন্টারনেট-সমস্ত ডিজিটাল ডিভাইস থেকে বিরতি হল সম্পূর্ণ ডিজিটাল ডিটক্স। যা সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং। এতে দৈনন্দিন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই এমন সিদ্ধান্ত নিলে পরিবার-পরিজনদের আগে থেকে জানিয়ে রাখা জরুরি। আংশিক ডিজিটাল ডিটক্সে মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার সীমিত করা হয়, তবে নেটফ্লিক্স বা ইউটিউবের মতো প্যাসিভ মিডিয়া দেখা যেতে পারে। এই পদ্ধতিতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। সোশ্যাল মিডিয়া, হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকের মতো অ্যাপ থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়া হয় সিলেক্টিভ ডিটক্সে। 

সময় ধরে ডিটক্স: নিজের কাজ, দায়িত্ব ও মানসিক প্রস্তুতি অনুযায়ী ডিজিটাল ডিটক্স করতে সময়ের গাইডলাইন মানার চেষ্টা করুন। যেমন এক ঘণ্টা করে, সপ্তাহে পাঁচ দিন অথবা সপ্তাহে দু’দিন চার ঘণ্টা করে, মাসে দু’বার ২৪ ঘণ্টা কিংবা মাসে একবার ৪৮ ঘণ্টা। 

মানসিক প্রস্তুতি: অনেকেই ডিজিটাল দুনিয়া থেকে দূরে থাকতে গিয়ে এক ধরনের ‘উইথড্রয়াল’ অনুভব করেন। অস্থিরতা, রাগ, অকারণ চিন্তা, বুক ধড়ফড়, ঘুমের সমস্যা—এসব লক্ষণ দেখা দেয়। আসলে নেশার মতো মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলতে পারে ডিজিটাল আসক্তি। তাই ডিটক্স করতে হলে এমন কাজ করুন যা আপনার নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে। দলবদ্ধভাবে ডিটক্স করলে সাফল্যের সম্ভাবনা বেশি থাকে। 

শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন: ডিটক্সের সময় স্ট্রেস কাটানোর সবচেয়ে ভাল উপায় হল শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা। সাইক্লিং, দৌড়ানো, নাচ, যোগা, ওয়েট ট্রেনিং, ইনডোর স্পোর্টস বা হাইকিং-যা ভাল লাগে তাই করুন। জুতো, পোশাক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যবস্থা রাখুন।

স্ত্রিন ছাড়া সৃজনশীলতা: মোবাইল, গ্যাজেটের উপর নির্ভরশীল না হয়ে নাচ, জার্নাল লেখা, রান্না, সেলাই, ছবি আঁকার মতো সৃজনশীল কাজ করুন। এতে মন অনেকটাই স্থির থাকবে।

ভার্চুয়াল নয়, বাস্তবে সামাজিকতা: সমাজমাধ্যমে নয়, মুখোমুখি বসে বন্ধু, প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটান। সপ্তাহে অন্তত একটা দিন সামাজিকভাবে যুক্ত থাকার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

রিল্যাক্সেশনেই রিসেট: মেডিটেশন, মাইন্ডফুলনেস, ডিপ ব্রিদিং, প্রগ্রেসিভ মাসল রিল্যাক্সেশন-এসব পদ্ধতি ডিটক্সের সময়ে ভীষণ কাজে দেয়। প্রয়োজনে পেশাদার প্রশিক্ষকের সাহায্য নিতে পারেন। নিজে গান করা কিংবা মোবাইলে আগে থেকে ডাউনলোড করে গান শুনতে পারেন।

নিজেকে গড়ার সময়: ওয়ার্কশপ, বই পড়া, গল্প বলার আসর, ছবির প্রদর্শনী-এই ধরনের পার্সোনাল গ্রোথ ও শিক্ষামূলক কাজ ডিজিটাল ডিটক্সে সাহায্য করে।

সংস্কৃতিতে মন ভরুক: ডিজিটাল দুনিয়া থেকে দূরত্ব বাড়াতে সাংস্কৃতিকভাবে বিনোদনের জায়গা খুঁজে নিতে হবে। যেমন ধরুন আপনি যদি কলকাতায় থাকেন তাহলে এই শহরের মিউজিয়াম, ঐতিহাসিক জায়গা, থিয়েটার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান-এসবের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন।  

সবুজে স্বস্তি: গাছে জল দেওয়া, বাড়ির ছাদে কিংবা আশেপাশের পার্কে অলসভাবে বসে পাখি দেখার অভ্যাস, পোষ্যর সঙ্গে সময় কাটানো-এই সব অভ্যাসও মনে গভীর প্রভাব ফেলে।‌‌