পরমা দাশগুপ্ত
দেখতে দেখতে আদরের মেয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে চলল। হাতে আর মাস দুয়েক মোটে! মায়ের টেনশন, মেয়েরও। তবে দু’জনের উদ্বেগ কিন্তু দু’জায়গায় দাঁড়িয়ে। মা ভাবছেন, বিয়ের আগে শেষমুহূর্তের শপিং, ছুটোছুটি, স্ট্রেস পেরিয়ে মেয়ের শরীর-স্বাস্থ্য যেন ভাল থাকে। আর মেয়ে? তার চিন্তা ত্বকের জেল্লা নিয়ে। সাজ যতই দারুণ হোক, মেকআপ হোক দুর্দান্ত, ত্বক নিষ্প্রভ-নিষ্প্রাণ হয়ে থাকলে যে সবটাই মাটি! এখানে বলে রাখা ভাল, দু’রকম উদ্বেগেরই নেপথ্যের কারণগুলো কিন্তু একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আর দুয়েরই সমাধান রাখা আছে ঠিকমতো খাওয়াদাওয়ার রুটিনে।
আসলে একটা কথা মাথায় রাখা জরুরি। ত্বক পরিচর্যা বা বাড়তি যত্ন যতই করুন, আপনার শরীর-স্বাস্থ্য সঙ্গ না দিলে কিন্তু ঠিক ঠিক ফল পাবেন না কিছুতেই। আর যদি সেদিকটায় যথাযথ নজর থাকে, তবে একদিকে যেমন শরীর-স্বাস্থ্য থাকবে রোগমুক্ত, ঝরঝরে, তেমনই আপনার ত্বক ভিতর থেকেই হয়ে উঠবে প্রাণবন্ত। আর তার জন্য বিয়ের আগে তবে কীভাবে ডায়েট সাজাবেন? তার জন্য বিশেষ টিপস রইল ডায়েটিশিয়ান পম্পা রায়ের তরফে।
পম্পার মতে, বিয়ের দিনটায় ঝলমলে হয়ে উঠতে হলে নিয়ম মেনে সঠিক ডায়েটের পথে হাঁটতে হবে অন্তত দু’মাস আগে থেকে। আর তাতে চাই সুষম খাদ্য অর্থাৎ প্রোটিন, ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট, খনিজ পদার্থ ও জলের ঠিকমতো মিলমিশ। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় এগুলো থাকতে হবে।
পম্পার কথায়, “এই দুটো মাস জোর দিন হাল্কা, কম তেলমশলার ঘরোয়া খাবারে। তবে হলুদ, জিরে গুঁড়ো, গোটা গোলমরিচ বা তার গুঁড়ো অবশ্যই খেতে হবে। প্রোটিনের ক্ষেত্রে মাছ, ডিম, মুরগির মাংস, দুধের ক্ষেত্রে ডাবল টোনড বা স্কিমড মিল্ক কিংবা ছানা বা দইয়ের মতো দুগ্ধজাতীয় পদার্থ, মুগ, মুসুর, অড়হরের মতো বিভিন্ন ধরনের ডাল এবং খোসা সমেত ডাল, রাজমা, সয়াবিন নিয়মিত খাওয়া জরুরি। বিশেষত নিরামিষাসী হলে বা ভিগান ডায়েট মেনে চললে ডাল থাকতেই হবে রোজের খাবারে। এছাড়া প্রতিদিন ২০০-২৫০ গ্রাম মরসুমি ফল রাখুন খাদ্য তালিকায়। ব্রেকফাস্ট এবং লাঞ্চের মাঝে গোটা ফল বা ফ্রুট স্যালাড খেতে পারেন। তবে রস করে একেবারেই নয়। অনেকেই লো-কার্ব ডায়েটে বিশ্বাসী। কিন্তু এ সময়টায় শরীরে সঠিক পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট দরকার। সে ভাত-রুটি, চিঁড়ে-মুড়ি হোক বা জোয়ার-বাজরা-রাগি কিংবা কিনোয়া যা-ই খান, মেপে খাবেন। সেই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের শাক ও সব্জি খান নিয়মিত। হলুদ বা কমলা রঙের ফল বা শাকসব্জি খাওয়া জরুরি কারণ এতে আয়রন, ক্যালশিয়াম, পটাশিয়াম, জিঙ্ক থাকে যা রক্তাল্পতা কমায়, হাড়-দাঁত-চুলের স্বাস্থ্য ভাল রাখে। যেমন গাজর, পাকা পেঁপে, কুমড়ো ইত্যাদি। মরসুমি শাক ভরপুর থাকে অ্যান্টি অক্সিড্যান্টে।”
পম্পা আরও জানান, এ সময়টায় ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ বা ডিনার কোনওটাই বাদ দেওয়া চলবে না। আর তাতে অবশ্যই থাকতে হবে প্রোটিন। ব্রেকফাস্ট হতে হবে ভারী। এ ছাড়া এই তিনটে বড় মিলের মাঝখানে রাখতে হবে ছোট ছোট স্ন্যাক্স। অল্প অল্প করে বারে বারে খাওয়া জরুরি। সকালে যদি ফল খান, বিকেলে অঙ্কুরিত ছোলা শশা-পেঁয়াজ দিয়ে মেখে খাওয়াই যায়। ছোলাভাজা, মাখানা, শুকনো খোলায় ভাজা চিঁড়েও চলতে পারে। তিনি আরও বলেন, “এ সময়টায় শরীরে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডও জরুরি, যা পাওয়া যায় নানা ধরনের বাদামে। এ ছাড়া, ড্রাই ফ্রুটস, খেজুর, ঘুম থেকে উঠে কাঁচা হলুদ কিংবা রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে দুধ-হলুদ খাওয়া উপকারী। পাশাপাশি, নিয়মিত ঘরে পাতা দই খান, যা প্রোবায়োটিক হওয়ার কারণে হজমে সাহায্য করে, অন্ত্রের কার্যকারিতাও ঠিক রাখে। খাবারের পাশাপাশি রোজ দুই থেকে আড়াই লিটার জল খেতেই হবে। তাতে আর্দ্র ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল থাকবে ত্বক। চাইলে চিনি ছাড়া পুদিনা পাতা দিয়ে পাতিলেবুর সরবতও খাওয়া যায়। সপ্তাহে অন্তত চার থেকে পাঁচ দিন কচি ডাবের জল খেতে পারলে খুবই ভাল।”
পম্পা বলছেন, ডায়েটের পাশাপাশি নিয়মিত কুড়ি-পঁচিশ মিনিট হাঁটতে হবে নিজের উচ্চতা অনুযায়ী সঠিক ওজন বজায় রাখতে। আর খাওয়াদাওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ মেনে তবেই এগোতে হবে, গুগল কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া টিপসে ভর করে নয়। কারণ প্রত্যেকেরই শরীর-স্বাস্থ্য এবং চেহারার একটা নির্দিষ্ট ধরন আছে, যা মাথায় রেখে ডায়েট প্ল্যান হলে তবেই তা কার্যকরী হয়।
ঝকঝকে চেহারায়, ঝলমলে ত্বকে নজর কাড়তে হলে তাই বিয়ের আগে দুটো মাস ভরপুর পরিশ্রমের পালা। অবশ্য কষ্ট করলে তবেই তো কেষ্ট মিলবে, তাই না?
