বরাবরই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তি তারা ,এবং ফুটবলে এইমুহূর্তে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দেশ আর্জেন্টিনা। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির বিশ্বজয়ের পর একটি প্রশ্ন আন্তর্জাতিক মহলে জোর উঠেছিল— লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশ যেমন ব্রাজিল, কলম্বিয়া বা উরুগুয়ে দলে প্রচুর কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার থাকলেও আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে কেন কোনও কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়ার দেখা যায় না? এমনকি সাধারণ তথ্যেও আর্জেন্টিনাকে একটি ‘শ্বেতাঙ্গ প্রধান’ দেশ হিসেবে গণ্য করা হয়।
ইতিহাস বলছে, একসময় আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেসের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ছিলেন আফ্রো-বংশোদ্ভূত। তাহলে ১৯ শতকের শেষভাগের মধ্যে কীভাবে আর্জেন্টিনার কৃষ্ণাঙ্গ জনসংখ্যা এতটা নাটকীয়ভাবে কমে গেল? তাঁরা কি রাতারাতি গায়েব হয়ে গিয়েছিলেন? গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষ্ণাঙ্গরা আর্জেন্টিনা থেকে কখনওই সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হননি; বরং যুদ্ধ, মহামারী, খানিক সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় নীতি এবং ব্যাপক ইউরোপীয় অভিবাসনের ফলে ওঁদের উপস্থিতি প্রায় মুছে গিয়েছে।
আর্জেন্টিনার কৃষ্ণাঙ্গ জনসংখ্যা হ্রাসের মূলত ৪টি কারণ:
১৯ শতকে আর্জেন্টিনার বুক থেকে কৃষ্ণাঙ্গদের চাক্ষুষ উপস্থিতি কমে যাওয়ার পেছনে মূলত কয়েকটি বড় ঐতিহাসিক ও সামাজিক কারণ কাজ করেছিল -
১. যুদ্ধ এবং মহামারীর গ্রাস
১৯ শতকের শুরুতে আর্জেন্টিনার স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৮১০-এর দশক), পরবর্তী অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ এবং বিশেষ করে প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে হওয়া ‘ওয়ার অফ দ্য ট্রিপল অ্যালায়েন্স’ (১৮৬৫–১৮৭০)-এ বিপুল সংখ্যক আফ্রো-আর্জেন্টাইন পুরুষদের জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা হয়েছিল। ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধ করার কারণে এই কৃষ্ণাঙ্গ সেনাদের মৃত্যুর হার ছিল আকাশছোঁয়া। এর পাশাপাশি, ১৮০০-এর দশকের শেষের দিকে বুয়েনস আইরেসে ছড়িয়ে পড়া পীতজ্বর (ইয়েলো ফিভার) এবং কলেরা মহামারীতে শহরের দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষ্ণাঙ্গ বস্তিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা ওঁরদের জনসংখ্যা এক ধাক্কায় অনেকটা কমিয়ে দেয়।
২. গণ-ইউরোপীয় অভিবাসন
১৮৫০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে আর্জেন্টিনার সরকার দেশের আধুনিকীকরণ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘সাদা’ ইউরোপীয় অভিবাসীদের স্বাগত জানানোর জন্য বিশেষ নীতি গ্রহণ করে। এই সময় মূলত ইতালি এবং স্পেন থেকে লক্ষ লক্ষ শ্বেতাঙ্গ অভিবাসী আর্জেন্টিনায় এসে বসতি স্থাপন করেন। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের আগমনের ফলে দেশের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে আফ্রো-বংশোদ্ভূতদের শতাংশের হার এক লহমায় তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
৩. বর্ণসংকরীকরণ এবং ‘হোয়াইটওয়াশিং’
ইউরোপ থেকে আর্জেন্টিনায় আসা অভিবাসীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা নারীদের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। এর ফলে বহু ইউরোপীয় পুরুষ স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ এবং মিশ্রণ-প্রজাতির নারীদের বিয়ে করেন। কয়েক প্রজন্ম ধরে চলা এই ধারাবাহিক আন্তঃবিবাহের ফলে আফ্রো-আর্জেন্টাইনদের জিনগত বৈশিষ্ট্য ধীরে ধীরে শ্বেতাঙ্গদের বিশাল জিনের মাঝে মিশে যায়। একে সমাজবিজ্ঞানীরা এক ধরণের ‘জীবতাত্ত্বিক হোয়াইটওয়াশিং’ বলে উল্লেখ করে থাকেন।
৪. রাষ্ট্র-অনুমোদিত সাংস্কৃতিক বিলোপ
১৯ শতকের শেষের দিকে আর্জেন্টিনার তৎকালীন বুদ্ধিজীবী এবং শাসকেরা ‘সোশ্যাল ডারউইনিজম’ বা সামাজিক ডারউইনবাদের ছদ্ম-বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। তাঁরা আর্জেন্টিনাকে একটি ‘সম্পূর্ণ ইউরোপীয় ঐতিহ্যবাহী দেশ’ হিসেবে তুলে ধরার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচারণা শুরু করেন। সরকারি আদমশুমারি এবং নথিপত্র থেকে আফ্রো-পরিচয় বাদ দেওয়া হতে থাকে, যার ফলে কৃষ্ণাঙ্গ সংস্কৃতি ও পরিচয় সামাজিক ও সামাজিকভাবে প্রান্তিক হয়ে পড়ে।
আফ্রো-আর্জেন্টাইন ইতিহাস মূল প্রভাব ও ফলাফল
১৯ শতকের শুরুর দিক বুয়েনস আইরেসের জনসংখ্যার প্রায় ৩০% ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ বা আফ্রো-বংশোদ্ভূত।
১৮৬৫ - ১৮৭০ ট্রিপল অ্যালায়েন্সের যুদ্ধে ফ্রন্টলাইন সেনা হিসেবে বিপুল সংখ্যক কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষের মৃত্যু।
১৮৫০ - ১৯৩০ ইতালি ও স্পেন থেকে লাখ লাখ শ্বেতাঙ্গ অভিবাসীর আগমন ও জনসংখ্যার অনুপাত বদল।
বর্তমান পরিস্থিতি প্রায় ১,৫০,০০০ মানুষ নিজেদের আফ্রো-আর্জেন্টাইন হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।
(২০১০ জনশুমারি)
কৃষ্ণাঙ্গরা আর্জেন্টিনা থেকে হারিয়ে যাননি, বরং ওঁদের পরিচয়কে ইতিহাসের পাতার কোণে চেপে রাখা হয়েছিল। ২০১০ সালের আর্জেন্টিনার সরকারি আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ১,৫০,০০০ নাগরিক নিজেদের ‘আফ্রো-আর্জেন্টাইন’ বা আফ্রো-বংশোদ্ভূত হিসেবে সরাসরি স্বীকৃতি দিয়েছেন।
এছাড়াও, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে সেনেগাল, কেপ ভার্দে এবং লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশ (যেমন কলম্বিয়া ও কিউবা) থেকে নতুন করে অভিবাসীদের আসার ফলে আর্জেন্টিনার প্রধান প্রধান শহর, বিশেষ করে বুয়েনস আইরেসে কৃষ্ণাঙ্গ সংস্কৃতির দৃশ্যমানতা আবার বাড়ছে। ফুটবল বা সামাজিক পরিমণ্ডলে ওঁদের উপস্থিতি কম হলেও, আর্জেন্টিনার ডিএনএ-তে আফ্রো-সংস্কৃতির অবদান (যেমন ওঁদের বিখ্যাত ‘টাঙ্গো’ নাচের আদি উৎপত্তি) কিন্তু অনস্বীকার্য।















