আজকাল ওয়েবডেস্ক: হলদিয়া থেকে নেপালের বিরাটনগরের উদ্দেশে রওনা দেওয়া কাঁচা সয়াবিনতেল বোঝাই একটি ট্যাঙ্কার নিখোঁজ ছিল। এই ঘটনায় অবশেষে বড়সড় সাফল্য পেল কলকাতা পুলিশ। প্রায় চার মাসের দীর্ঘ ও জটিল তদন্তের পর রাজ্য ও ভিনরাজ্যে ছড়িয়ে থাকা একটি সংঘবদ্ধ তেল পাচার চক্রের পর্দাফাঁস করল কলকাতা পুলিশের ভবানীপুর থানা। ইতিমধ্যেই একাধিক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও তেলবাহী ট্যাঙ্কার।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই হলদিয়া থেকে কাঁচা সয়াবিন তেল ভর্তি একটি ট্যাঙ্কার (রেজিস্ট্রেশন নম্বর: NL02Q7743) নেপালের বিরাটনগরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। ট্যাঙ্কারে মোট ২৪ মেট্রিক টন তেল ছিল, যার বাজারমূল্য প্রায় ২০ লক্ষ টাকা। ট্রাকটির যাত্রা অনুযায়ী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যেই ট্যাঙ্কারটির গন্তব্যে পৌঁছানোর কথা থাকলেও মাঝপথেই নিখোঁজ হয়ে যায় সেটি। একই সঙ্গে পরিবহণ সংস্থার সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় চালক।
এরপর শক্তি লজিস্টিক্স-এর অনুমোদিত প্রতিনিধি ভবানীপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রুজু করে তদন্তে নামে পুলিশ। প্রথমদিকে কোনও স্পষ্ট সূত্র না মিললেও, আধুনিক প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক প্রমাণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তদন্ত এগোতে থাকে।
চার মাসের নিরলস অনুসন্ধানের পর পুলিশ জানতে পারে, ভুষণ যাদব নামে যে চালকের পরিচয় দেওয়া হয়েছিল, তিনি আদৌ আসল ব্যক্তি নন। রাজেশ কুমার নামে বিহারের নওয়াদা জেলার এক যুবক ভুয়ো নথি ও জাল সিম কার্ড ব্যবহার করে চালকের পরিচয়ে কাজটি সেরে ফেলে।
লালবাজার পুলিশ সূত্রে খবর, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে বিহারের পাকরিবারাওয়ান থানা এলাকা থেকে অভিযুক্ত রাজেশ কুমারকে গ্রেপ্তার করা হয়। ধৃতের জবানবন্দির ভিত্তিতে বিহারের জামা থানা এলাকা থেকে নিখোঁজ ওই তেল ট্যাঙ্কারটি উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্তে আরও উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
জানা গিয়েছে, ট্যাঙ্কারে থাকা ২৪ মেট্রিক টনের মধ্যে ২১ মেট্রিক টন কাঁচা সয়াবিন তেল ইতিমধ্যেই বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এই কাজে রাজেশ কুমারকে সহায়তা করে দুই মধ্যস্থতাকারী - প্রিতম দত্ত ওরফে ভাতিজা এবং মইনুদ্দিন আলি মণ্ডল ওরফে সোনাই। পুলিশ তাঁদেরও শনাক্ত করে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে উত্তর ২৪ পরগনার কিউটিয়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। জেরায় ধৃতরা স্বীকার করে, বর্ধমান জেলার পালশিট এলাকার এক তেল ব্যবসায়ীর কাছে তেল বিক্রি করা হয়েছিল। এরপর সেই সূত্র ধরেই শ্রীরামপুর থানা এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। ২ জানুয়ারি গভীর রাতে হুগলির বৈদ্যবাটি এলাকা থেকে রাজেশ সাউ নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, তিনিই এই তেল পাচার চক্রের মূল কালপ্রিট। তার বাড়ি থেকে বিক্রয়লব্ধ ২১ লক্ষ টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
তদন্তে আরও জানা যায়, রাজেশ সাউ দীর্ঘদিন ধরে বর্ধমানের পালশিট এলাকায় শক্তিগড় টোল প্লাজার কাছে সংগঠিতভাবে বেআইনি তেল ব্যবসা চালাতেন। দিল্লি রোড দিয়ে চলাচলকারী তেল ট্যাঙ্কারের চালকদের মোটা অঙ্কের প্রলোভন দেখিয়ে তেল সরিয়ে নেওয়াই ছিল তাঁর মূল কাজ। হলদিয়া, বজবজ, আলমপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ লোডিং পয়েন্টে তাঁর নিযুক্ত এজেন্টরাও সক্রিয় ছিল। লালবাজার পুলিশ সূত্রে আরও খবর, এই ঘটনার মাধ্যমে একটি সুসংগঠিত আন্তঃরাজ্য তেল পাচার চক্র সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
চার অভিযুক্তকে আজ আদালতে তোলা হয় এবং পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়, জানিয়েছে ভবানীপুর থানার পুলিশ। তবে এখনও তদন্ত চলছে। এই চক্রের পিছনে আরও কেউ আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা চলছে।
