গোপাল সাহা
কথায় বলে ‘একের বোঝা দশের লাঠি’। ঠিক তেমনই কলকাতা আরজি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যৌথ প্রচেষ্টার ফলে এল বিরাট সাফল্য। এক প্রসূতি মায়ের বিরল রোগের চিকিৎসায় সন্তান ও মা ফিরল পরিবারের কাছে। হাসপাতালের তিনটি বিভাগের যৌথ প্রচেষ্টায় এই বিরাট সাফল্য কলকাতা তথা রাজ্যে নজির গড়ল। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, এই জটিল অস্ত্রোপচার সফল হওয়ায় চিকিৎসকদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই। রোগীর পরিবার এবং হাসপাতালের অন্যান্য সকলের চোখে মুখে কৃতজ্ঞতার ভাষা। একই সঙ্গে দু’টি জীবন বাঁচানোর এই অসাধারণ ঘটনা আরজি করের ইতিহাসে আরও একটি উজ্জ্বল অধ্যায় যোগ করেছে।
২১ জুলাই গভীর রাতের দিকে আরজি করের সার্জিক্যাল ইমার্জেন্সিতে এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন চিকিৎসকরা। ৩৩ বছর বয়সী এক গর্ভবতী মহিলাকে গুরুতর অবস্থায় আনা হয়। তিনি ৩১ সপ্তাহের অর্থাৎ সাত মাসের কিছু দিন বেশি গর্ভবতী ছিলেন। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, পেট ফুলে যাওয়া এবং মলত্যাগে সম্পূর্ণ অক্ষমতা ছিল সেই গর্ভবতীর। পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসকদের পরীক্ষায় ধরা পড়ে অন্ত্রে বাধা রয়েছে। মধ্য মলদ্বারে একটি বাধা সৃষ্টিকারী বৃদ্ধিই এর মূল কারণ। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। মায়ের জীবন বিপন্ন, সঙ্গে গর্ভস্থ শিশুর জীবনও ঝুঁকির মুখে। তাছাড়া মহিলার আগে দু’বার সিজারিয়ান এবং আরও একটি ল্যাপারোটমি হয়েছিল। সময়ের অভাবে চিকিৎসকদের হাতে খুব কম সময়ই ছিল।
এই পরিস্থিতিতে আরজি করের জরুরি ভিত্তিতে গঠিত হয় একটি বহুবিভাগীয় দল। জেনারেল সার্জারির নেতৃত্ব দেন চিকিৎসক অগ্নিক সাহা। সঙ্গে ছিলেন চিকিৎসক ঈশিকা মুখোপাধ্যায়, আব্বাস মোহন ও ত্রিনেশ মণ্ডল। প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের নেতৃত্বে চিকিৎসক সুতিথি ব্যানার্জি এবং চিকিৎসক সৌম্যদীপ। অ্যানেস্থেসিয়া বিভাগের নেতৃত্বে চিকিৎসক শ্রাবণী সরকার ও রবি কুমার। সঙ্গে ছিলেন নবজাতক পরিচর্যা দলও।
অস্ত্রোপচার শুরুর ঠিক আগে আরও এক কঠিন বিপদের মুখোমুখি হতে হয় ডাক্তারদের। ভ্রূণের হৃদস্পন্দন সেই সময় শোনা যাচ্ছিল না। প্রতিটি মিনিট হয়ে উঠেছিল জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। রীতিমত আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন সেই মুহূর্তে চিকিৎসকদের পুরো টিম। অপারেশন থিয়েটারে চলে প্রায় এক ঘণ্টার তীব্র ও সমন্বিত রুদ্ধশ্বাস লড়াই। সমস্ত বাধা জয় করে অবশেষে চিকিৎসকদের দক্ষতা, সাহস ও দলীয় সমন্বয়ের জয় হয়। মা ও শিশু— দু’জনেরই জীবন রক্ষা পায়। এই সাত মাসের অপরিণত শিশুকে সঙ্গে সঙ্গে NICU-তে স্থানান্তর করা হয়। মাকে পাঠানো হয় সার্জিক্যাল আইসিইউ-তে। মাত্র তিন দিনের মধ্যেই ওই ‘মা’ স্থিতিশীল হয়ে সাধারণ ওয়ার্ডে চলে আসেন। শিশু বিভাগ জানিয়েছেন শিশুও পূর্বের তুলনায় অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠছে।
এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আমাদের সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে প্রসূতি বিভাগের চিকিৎসক সুতিথি ব্যানার্জি বলেন, “যখন এই মহিলা আসেন তখন আমরাই খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম কীভাবে কী করব। একদিকে তিনি সন্তানসম্ভবা এবং অন্যদিকে, তাঁর এই মলদ্বারে টিউমারের কারণে তাঁর মলত্যাগ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে ক্রমাগত পেট ফুলে উঠছিল, সঙ্গে ভয়ানক ব্যথা। বলতে পারি আমাদের এই তিন বিভাগের চিকিৎসকদের যৌথ প্রচেষ্টায় মা এবং বাচ্চা দু’জনকেই ফিরিয়ে দিতে পেরেছি পরিবারের কাছে। এক অদ্ভুত তৃপ্তি পেয়েছি এই সাফল্যের কারণে।”
সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক অগ্নিক সাহা বলেন, “প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘন্টা সময় ধরে এই অপারেশনের অধ্যায়টি চলে। পরিস্থিতি যে অবস্থায় এসেছিল তাতে প্রথমে শিশুটিকে বার করে আনা হয়। এরপর ওই মায়ের মলদ্বারের মধ্যভাগে টিউমারটি অপারেশন করা হয়। এক বিরাটে জটিল রোগ যা আমার ডাক্তারি জীবনে এই প্রথম অভিজ্ঞতা। এ এক বিরল রোগের চিকিৎসা বলা যেতে পারে। তবে মা এবং সন্তানকে একসাথে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়াটা আমাদের এক বিরাট প্রাপ্তি। প্রচন্ড একটা শান্তি অনুভব করছি এই সাফল্যে। আর এই সাফল্য আমাদের হাসপাতালের তিন বিভাগের একত্রিত সহযোগিতা ও অন্যান্য উপস্থিত সহকারীদের ছাড়া সম্ভব ছিল না।”
অ্যনাস্থেসিয়া বিভাগের চিকিৎসক শ্রাবণী সরকার বলেন, “এক বিরল রোগের ঘটনা। আমি আমার এত বছরে কর্মজীবনে পূর্বে এমন ঘটনা দেখিনি। প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘন্টা অস্ত্রপচার করে এই অপারেশন সম্পূর্ণ হয়েছে। খুবই বিপজ্জনক পরিস্থিতি ছিল যখন এই গর্ভবতী মহিলাকে নিয়ে আসা হয়। আমরা চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম কী করা হবে। আমাদের এই তিন বিভাগ- গায়নোকোলজি, সার্জারি এবং অ্যানাস্থেশিয়া এই তিন বিভাগের যৌথ প্রচেষ্টায় এত বড় সাফল্য এসেছে। আর সবচেয়ে বেশি ভাল লাগছে সন্তান এবং মা দু’জনেই এখন সুস্থ। ৭২ ঘন্টা যে সময়ের কথা বলা হয়েছিল সেই বিপদ কেটে গিয়েছে। সন্তান এবং মা দু’জনেই ভাল আছেন।”
















