আজকাল ওয়েবডেস্ক:  রাজ্যে পালাবদল হলেও পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলে দুর্নীতি ও গুন্ডাগিরির জাল আজও বিস্তৃত শহর কলকাতা সহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায়। আর এবার সেই হুলিগানিজম বা গুন্ডাগিরির শিকার শহর কলকাতার নামজাদা পুজো কমিটি দেশপ্রিয় পার্ক সার্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি। এমনটাই অভিযোগ রয়েছে ক্লাব ও পূজা কমিটির কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে। এক সময় দেশপ্রিয় পার্ক যারা দেশ তথা বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছিল ২০১৫ সালে, সেই পুজো কমিটি আজ ভাঙার মুখে। 

পাশাপাশি সাম্প্রতি দেশপ্রিয় পার্ক দুর্গোৎসবকে ঘিরে  বিতর্ক ও একাধিক অভিযোগের আবহে মুখ খুলল বালিগঞ্জ সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি। এক বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সমিতি জানিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ছড়িয়ে পড়া একাধিক দাবি সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর, একপাক্ষিক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একইসঙ্গে, প্রায় ৮৮ বছরের পুরনো এই ঐতিহ্যবাহী সংগঠন সমাজসেবা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার পুনরায় তা ব্যক্ত করেছে। 

১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বালিগঞ্জ সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি, যা দেশপ্রিয় পার্ক দুর্গোৎসব নামেই অধিক পরিচিত, দীর্ঘদিন ধরেই কলকাতার অন্যতম প্রধান শারদোৎসবের আয়োজক। পাড়ার একটি ছোট উদ্যোগ থেকে শুরু করে আজ তা আন্তর্জাতিক স্তরেও পরিচিতি লাভ করেছে। বিশেষত, ২০১৫ সালে বিশ্বের সর্বোচ্চ দুর্গা প্রতিমা নির্মাণের মাধ্যমে দেশপ্রিয় পার্ক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং একাধিক রেকর্ডের গড়ে তোলে। 

সমিতির দাবি, ৪ মে ২০২৬-এর আগে পর্যন্ত তাদের ভাড়াটিয়া হিসেবে অবস্থান বা ব্যবহৃত পরিকাঠামো নিয়ে কখনও কোনও বিরোধ, অভিযোগ বা আইনি পদক্ষেপের নজির নেই। অথচ, ওই সময়ের পর থেকেই কিছু ব্যক্তি ধারাবাহিকভাবে সংগঠনটির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। 

 পুজো কমিটি কর্তৃপক্ষ এদিন রবিবার ২৬ শে জুলাই সাংবাদিক বৈঠকে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযোগকারীদের কেউ বর্তমানে সমিতির সদস্য নন। তাঁদের মধ্যে একজনকে ২০১০ সালে আর্থিক অনিয়ম এবং গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। গত ১৬ বছর ধরে ওই ব্যক্তির সঙ্গে সমিতির কোনও প্রশাসনিক বা সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করা হয়েছে। 

সমিতির বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটি, যারা চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে পূর্ববর্তী প্রশাসনিক নথিপত্র পুনরুদ্ধার ও যাচাইয়ের কাজ চলছে। তবে ২০২৫ সালের শেষদিকে আকস্মিক মেঘভাঙা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে বহু গুরুত্বপূর্ণ নথি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায়, এই প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগছে। 

দেশপ্রিয় পার্কের অভ্যন্তরে অবস্থিত পুরনো ক্লাবঘরটি ২০১৩ সালে ভাষা স্মারক ঘূর্ণায়মান মঞ্চ নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণ করা হলে প্রশাসনিক কাজ মতিলাল নেহরু রোডে স্থানান্তরিত হয়। পরবর্তীতে, ২০২১ সালে কলকাতা পুরসভা একটি নবনির্মিত পরিকাঠামো দেশপ্রিয় পার্ক দুর্গোৎসব সমিতি ও মিলন সমিতির যৌথ ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ করে। সমিতির দাবি, সেই সময় থেকে তারা নিয়মিতভাবে ভাড়া, লাইসেন্স ফি এবং অন্যান্য আইনসিদ্ধ বকেয়া পরিশোধ করে আসছে। 

সমস্ত বিতর্কের অবসান ঘটাতে বালিগঞ্জ সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি তথা দেশপ্রিয় পার্ক পূজা কমিটি জানিয়েছে, প্রয়োজনে তারা লিজ চুক্তিপত্র, কলকাতা পুরসভার রসিদ, অনুমতিপত্র এবং অন্যান্য সরকারি নথি যে কোনও ক্ষমতাসম্পন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করতে প্রস্তুত।  

এই পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর সেন আমাদের সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বলেন, "আমাদের পুজোকে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আমরা রাজ্য সরকারকে জানিয়েছি এবং কলকাতা কর্পোরেশন কে ও বিষয়টা জানিয়েছি। তবে আমাদের যে অফিস বিল্ডিং রয়েছে তা ভেঙে দেওয়ার জন্য কলকাতা কর্পোরেশন নোটিশ দিয়ে গেছে। আমরা এর উত্তর অবশ্যই দেব সমস্ত নিয়ম মেনে। একই সাথে আমরা আইনের উপর ভরসা রাখি তাই আদালতে দারস্ত হয়েছি। তবে বেশ কিছু মানুষ যাদেরকে পূজা কমিটি পূর্বে বার করে দিয়েছিল টাকা তছরুপের কারণে, তারাই আমাদের বদনাম এবং পূজো ভেঙ্গে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।"

 তবে পূজা কমিটির বক্তব্য, তাঁরা প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছে, যেন তাঁরা বিনা যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে কোনও সিদ্ধান্তে না পৌঁছন এবং শুধুমাত্র যাচাইকৃত তথ্য ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখেন। ঐতিহ্য, সমাজসেবা এবং জনসম্পৃক্ততার উত্তরাধিকার বহনকারী দেশপ্রিয় পার্ক দুর্গোৎসবকে ঘিরে এই বিতর্ক আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর কলকাতাবাসী সহ রাজ্যবাসীর।