আজকাল ওয়েবডেস্ক: ষাট বছরেরও বেশি সময় আগের এক শীতল সকালের কথা। ১৯৬১ সালের ৩০ অক্টোবর আর্কটিক সাগরের প্রত্যন্ত এক দ্বীপে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী পারমাণবিক বোমার, যার নাম দেওয়া হয়েছিল 'জার বোম্বা' বা বোমাদের রাজা। সাধারণ মানুষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে এই ঘটনাটিকে ক্রুশ্চেভের রাজনৈতিক দাপট বা শক্তির প্রদর্শন হিসেবেই দেখানো হয়েছে। কিন্তু পারমাণবিক ইতিহাসবিদ অ্যালেক্স ওয়েলারস্টেইনের একটি নতুন গবেষণা এবং সম্প্রতি অবমুক্ত হওয়া কিছু গোপন সরকারি নথিপত্র এই বোমার পেছনের এক সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং চমকপ্রদ সত্য সামনে নিয়ে এসেছে।

বিস্ফোরণটি কতটা মারাত্মক ছিল, তা শুধু সংখ্যার বিচারে বোঝা কঠিন। হিরোশিমায় ফেলা বোমার চেয়ে এটি ছিল প্রায় ৩৩০০ গুণ বেশি শক্তিশালী। এর ফলে তৈরি হওয়া আগুনের গোলাটি আকাশে প্রায় ছয় মাইল জুড়ে বিস্তৃত হয়েছিল এবং মাশরুম ক্লাউড বা ধোঁয়ার মেঘ বায়ুমণ্ডলের সীমানা ছাড়িয়ে মহাকাশের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। অথচ ভয়ের বিষয় হল, এই বোমাটি আসলে ১০০ মেগাটনের শক্তি দিয়ে তৈরি করার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে পরিবেশের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়কারী প্রভাবের কথা চিন্তা করে সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা এর ক্ষমতা অর্ধেক বা ৫০ মেগাটনে নামিয়ে আনেন।

সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি অবশ্য রাশিয়ার নয়, বরং আমেরিকার। জনসমক্ষে যখন আমেরিকা এই সোভিয়েত পরীক্ষাকে এক ধরণের পাগলামি বা ফাঁকা আওয়াজ বলে উপহাস করছিল, পর্দার আড়ালে তখন মার্কিন বিজ্ঞানীরা নিজেরাও এর চেয়েও বড় দানবীয় বোমা বানানোর নকশা তৈরি করছিলেন। মার্কিন পরমাণু বোমার জনক এডওয়ার্ড টেলার তখন ১০ হাজার মেগাটন ক্ষমতার এক কল্পনাতীত বোমার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছিলেন, এই ধরণের একটি বোমা যদি ভূপৃষ্ঠ থেকে ২৮ মাইল ওপরেও ফাটানো যায়, তবে এক নিমেষে ফ্রান্সের মতো একটি আস্ত দেশ আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। আমেরিকার অনেক বিজ্ঞানী নিজেই এই ধারণায় শিউরে উঠেছিলেন।

সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য এই বোমাটি কেবল লোকদেখানো কোনো বিষয় ছিল না, বরং তাদের প্রযুক্তির এক বিরাট লাফ ছিল। বিজ্ঞানী আন্দ্রেই শাখারভ এবং তাঁর দল প্রমাণ করেছিলেন যে, তাঁরা চাইলে যেকোনও  আকারের পরমাণু বোমা তৈরি করতে সক্ষম। আমেরিকার তৎকালীন কেনেডি প্রশাসনের গোপন নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, মার্কিন সামরিক নীতিপ্রণেতারা এই ঘটনাকে মোটেও হালকাভাবে নেননি। তাঁরা গভীরভাবে ভেবেছিলেন যে মাটির গভীরে থাকা সোভিয়েত বাঙ্কার ধ্বংস করতে আমেরিকারও এমন দানবীয় বোমার প্রয়োজন আছে কি না। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁরা সেই পথ থেকে সরে আসেন এবং বোমার আকার না বাড়িয়ে ক্ষেপনাস্ত্রের নিশানা নিখুঁত করার দিকে মনোযোগ দেন।

ইতিহাসের এই অধ্যায়টি বর্তমান পৃথিবীর জন্যও এক বড় সতর্কবার্তা। জাতীয়তাবাদ, ভয় আর উন্নত প্রযুক্তির অন্ধ অহংকার কীভাবে পরাশক্তিগুলোকে এমন এক মারণাস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিতে পারে—যার কোনও বাস্তব সামরিক যুক্তি নেই, কেবলই এক আত্মঘাতী উন্মাদনা—জার বোম্বার গল্প আমাদের সেই নির্মম সত্যেরই মুখোমুখি দাঁড় করায়।