আজকাল ওয়েবডেস্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা ফের চরমে পৌঁছেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগ তুলে বুধবার ভোরে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একাধিক সামরিক হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে "শক্তিশালী ও লক্ষ্যভিত্তিক" সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে, যার উদ্দেশ্য তেহরানকে বড় ধরনের মূল্য চোকাতে বাধ্য করা।
এক্সে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলা যুদ্ধবিরতি চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি। সেই কারণেই পাল্টা এই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র, সারফেস-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র, অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইল এবং ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রকে নিশানা করা হয়েছে। অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সামরিক ক্ষমতাকে দুর্বল করা এবং ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঝুঁকি কমানো।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক শহরে পরপর সাতটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। সিরিকের তাহেরৌই বন্দর এলাকায় অন্তত ছয়টি প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি কেশম দ্বীপ এবং বন্দর আব্বাস এলাকাতেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইরানের সরকারি টেলিভিশনের দাবি, সিরিক বন্দরে একটি "শত্রু প্রজেক্টাইল" আঘাত হানায় কয়েকজন আহত হয়েছেন। যদিও পরে জানানো হয়, বন্দর আব্বাস ও কেশম দ্বীপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে, তবে সিরিকে বিস্ফোরণের শব্দ কিছু সময় পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
এই হামলার পর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ইরাক সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে গিয়েছেন বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার, যখন হরমুজ প্রণালিতে তিনটি তেলবাহী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে তিনটি ট্যাঙ্কার প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে একটি জাহাজে আগুন ধরে যায়, যদিও অন্য দুটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থাতেই যাত্রা চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
এই ঘটনার পরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানি তেল রপ্তানির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার জন্য গত মাসে জারি করা ৬০ দিনের লাইসেন্স বাতিল করে। মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পদক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয় বলেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শান্তিকালীন পরিস্থিতিতে বিশ্বের সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, তেলের দাম এবং বিশ্বের সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলা আলোচনা কার্যত স্থগিত রয়েছে। ওয়াশিংটন একদিকে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে চাইছে, অন্যদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন সমঝোতারও চেষ্টা করছে। তবে সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনায় সেই কূটনৈতিক প্রক্রিয়া আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের আশঙ্কা, দ্রুত উত্তেজনা প্রশমিত না হলে মধ্য এশিয়াতে আরও বড় সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।















