আজকাল ওয়েবডেস্ক: হিজাব না পরে অনলাইন কনসার্টে গান আর তাতেই বিপত্তি! সেই অপরাধে ইরানের জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী পরাস্তু আহমাদি এবং তাঁর দলের আট সদস্যকে সাজা দিল আদালত। জানা গিয়েছে, মোট ৭৪টি করে বেত্রাঘাতের সাজা ঘোষণা করেছে দেশের একটি আদালত। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম 'দ্য গার্ডিয়ান'-এর এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।

 

আদালতের নথি অনুযায়ী, ইরানের কোম প্রদেশের একটি ফৌজদারি আদালত এই শাস্তি ঘোষণা করেছে। বেত্রাঘাতের পাশাপাশি ওই শিল্পী ও কলাকুশলীদের ওপর দুই বছরের জন্য দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি, দু'বছর কোনওরকম শৈল্পিক বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে মূলত ইউটিউবে 'অশ্লীল ও অনৈতিক কন্টেন্ট' তৈরি এবং প্রচারের মাধ্যমে শালীনতা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে ইরানের বিচারবিভাগীয় সংবাদসংস্থার পক্ষ থেকে এই রায় এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

 

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। যখন ২৭ বছর বয়সী এই গায়িকা তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে একটি লাইভস্ট্রিমিং কনসার্টের আয়োজন করেন। সেখানে তিনি 'আজ খুনে জাভানানে ভাতান' নামক একটি জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন। ভিডিওটিতে দেখা যায়, তাঁর পরনে ছিল একটি স্লিভলেস কালো পোশাক। তবে মাথায় কোনও হিজাব ছিল না। বরং চুল খোলা ছিল। চারজন পুরুষ সঙ্গীতশিল্পীর সঙ্গে পরিবেশিত তাঁর এই ভিডিওটি দ্রুত সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। এর পর লক্ষ লক্ষ মানুষ তা ইউটিউবে দেখেন। ভিডিওটি প্রকাশের পরপরই পরাস্তু এবং বেশ কয়েকজন সঙ্গীতশিল্পীকে কিছুদিনের জন্য আটক করা হয়। পরে ছেড়েও দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হয়।

 

আদালতের এই রায়ের পর বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। মানবাধিকার কর্মী এবং আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, "এই ঘটনা প্রমাণ করে যে ইরানের শাসনব্যবস্থা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর দমনে প্রশাসন কতটা কঠোর।"

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরান'-এর বাহার গান্দেহারি বলেন, "কেবলমাত্র হিজাবছাড়া গান গাওয়ার জন্য পরাস্তুকে ৭৪টি বেত্রাঘাতের শাস্তি লজ্জাজনক। যা মনে করিয়ে দেয় যে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য ইরান সরকার যতই প্রচার চালাক না কেন, সে দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়নি।" প্রখ্যাত সাংবাদিক মাসিহ আলিনেজাদও এই ঘটনাকে "নারীদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ" বলে আখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন, "ইরান সরকার নারী কণ্ঠস্বরকে নিজেদের জন্য হুমকি মনে করে।

 

নির্বাসিত ইরানি অভিনেত্রী সেতারেহ মালেকি এবং ব্রিটিশ-ইরানি অভিনেত্রী নাজানিন বোনিয়াদিও এই রায়ের তীব্র সমালোচনা করেছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলির মতে, এই কঠোর শাস্তি মূলত অন্যান্য শিল্পীদের মনে ভয় ধরানো এবং জনসমক্ষে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ রুখে দেওয়ার একটি পরিকল্পিত চেষ্টা।