আজকাল ওয়েবডেস্ক: প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে বাতিল করা হয়েছে ৩ মে-র নিট-ইউজি পরীক্ষা। সেই পরীক্ষা ফের নেওয়া হবে ২১ জুন। এবার নিট পরীক্ষায় নিরাপত্তা জোরদার করতে তৎপর কেন্দ্র। যেহেতু এখন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর (পিএমও) সরাসরি এই পরীক্ষার প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করছে, তাই শিক্ষা মন্ত্রক একটি নজিরবিহীন পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বিবেচনা করছে। তা হল, প্রশ্নপত্রের লজিস্টিক ও পরিবহনের কাজে প্রতিরক্ষা বাহিনীকে যুক্ত করা। আর এতেই যে প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়েছে তা হল, তাহলে কী দেশব্যাপী একটি সুষ্ঠু পরীক্ষা আয়োজন করা সত্যিই কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে?

৩রা মে-র নিট-ইউজি বাতিলের ঘটনায় ২৩ লক্ষ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছিল এবং দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক, বিক্ষোভ দানা বাঁধে। এই পুরো বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে 'ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি' (এনটিএ), যারা নিট-সহ দেশের অধিকাংশ বড় কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগুলি আয়োজন করে থাকে। এখন পর্যন্ত চলা তদন্তে দেখা গিয়েছে যে, প্রিন্টিং প্রেস থেকে পরীক্ষার কেন্দ্রগুলোতে নিট-এর প্রশ্নপত্র পৌঁছানোর পুরো যাত্রাপথে একাধিক স্থানে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঝুঁকি বা ছিদ্রপথ ছিল। ঠিক এই ফাঁকগুলোই বন্ধ করার লক্ষ্যেই প্রতিরক্ষা বাহিনীকে এই কাজে যুক্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে।

প্রতিরক্ষা বাহিনীকে কেন যুক্ত করা হতে পারে?
সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সেই বৈঠকে ভারতীয় বিমান বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

ওই প্রতিবেদন অনুসারে, প্রিন্টিং প্রেস থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত পরীক্ষার কেন্দ্রগুলোতে নিট-ইউজি-র প্রশ্নপত্র পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করবে ভারতীয় বিমান বাহিনী। তাছাড়া, জুন মাসে বৃষ্টির কারণে আবহাওয়াও অনিশ্চিত থাকে। যা বিবেচনা করে সরকার মনে করছে যে, এই অত্যন্ত সংবেদনশীল নথিপত্রগুলি পরিবহনের দায়িত্ব বিমান বাহিনীর ওপর ন্যস্ত করাই হবে সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প।

সমস্যার একটি বড় অংশ নিহিত রয়েছে নিট পরীক্ষাটি আয়োজনের পদ্ধতির মধ্যেই। জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষাক মতো কম্পিউটার-ভিত্তিক না হয়ে, নিট পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হয় প্রচলিত 'পেন-অ্যান্ড-পেপার' বা খাতা-কলম পদ্ধতিতে। এখন পর্যন্ত, এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্রগুলি ডাক পরিষেবার মাধ্যমেই পরিবহন করা হত। এই প্রক্রিয়ায় একাধিকবার প্রশ্নপত্র হাতবদল হত এবং বহু কর্মকর্তা এর সঙ্গে যুক্ত থাকতেন। সহজ কথায় বলতে গেলে, পুরো প্রক্রিয়াটিতে মানুষের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের সুযোগ ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিরক্ষা বাহিনীকে এই কাজে যুক্ত করার সরকারি পদক্ষেপটি অসামরিক প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতি সরকারের গভীর অনাস্থারই ইঙ্গিত। এই অসামরিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন এনটিএ-র কর্মকর্তারা, পুলিশ এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গত ৩ মে-র প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পরিচালিত তদন্তে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে যে, ডাক পরিষেবার মাধ্যমে প্রশ্নপত্র পরিবহন প্রক্রিয়াটিই সম্ভবত প্রশ্নপত্র ফাঁসের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করেছিল। বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন: এই পদক্ষেপ কেন?

মেজর জেনারেল রাজু চৌহান (অবসরপ্রাপ্ত) এক্স-এ লিখেছেন, 'দেশের বিদ্যমান সব ব্যবস্থা কি ব্যর্থ হয়ে গিয়েছে যে শেষমেশ এই পথ বেছে নিতে হল? অপরাধীদের যদি দ্রুত শাস্তি না দেওয়া হয়, তবে পুরো ব্যবস্থাটাই দুর্নীতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়। নিট-এর ক্ষেত্রে ঠিক এমনটাই ঘটছে।' 

ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ রোহিত ভাটস বলেন, ভারতীয় বিমানবাহিনীকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করাটা 'বিশুদ্ধ লোক-দেখানো বা লোক-ভোলানো কৌশল' ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থার বিষয়টি এর সঙ্গে জড়িত। ভাটস আরও বলেন, "প্রতিরক্ষা বাহিনীকে নিট পরীক্ষার সঙ্গে জড়ানোটা একটি বোকামির পদক্ষেপ।"

রাজ্যসভার সাংসদ প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী সরকারের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। চতুর্বেদী টুইট করে লেখেন, "সেনাবাহিনী প্রিন্টিং সেন্টার থেকে নিট-এর প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করবে। এরপর বুলেট-প্রুফ গাড়িতে করে সেগুলো নিকটবর্তী বিমানঘাঁটিতে পৌঁছে দেওয়া হবে। সেখান থেকে বিমানবাহিনী উড়ানে করে সেই প্রশ্নপত্রগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেবে।" শিবসেনা (উদ্ধব গোষ্ঠী)-এর এই নেত্রী আরও বলেন, "তাহলে চলুন, উত্তরপত্রগুলো স্ক্যান করার জন্য এবং 'ওএমআর স্ক্যানিং'-এর উদ্দেশ্যে সার্ভারে আপলোড করার জন্য আমরা নৌবাহিনীর সাবমেরিন ব্যবহার করি!"

অর্থাৎ এই পুরো আলোচনার মূল শব্দটি হল 'আস্থা'। নিট পরীক্ষার এই বিপর্যয়ের দায় স্বীকার করে নিয়ে মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান জানিয়েছেন যে, ফের পরীক্ষার ক্ষেত্রে সরকার 'শূন্য-আস্থা, সর্বদা-তদারকি' —এই নীতি অনুসরণ করবে।

পরীক্ষা প্রক্রিয়ার দুর্বল দিকগুলি
প্রতিরক্ষা বাহিনীকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণটিই হল 'আস্থা' বা বিশ্বাস। বিষয়টি বোঝার জন্য আমাদের পরীক্ষা প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপগুলো সম্পর্কে জানতে হবে। প্রশ্নপত্র তৈরি থেকে শুরু করে প্রিন্টিং প্রেস এবং সবশেষে পরীক্ষা কেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ।

মনে করা হচ্ছে, গত ৩ মে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাটি সরাসরি মহারাষ্ট্রের নাসিকে অবস্থিত প্রিন্টিং প্রেস থেকেই ঘটেছে। এই ঘটনায় প্রথম গ্রেপ্তার শুভম খৈরনার পুনের এক ব্যক্তির কাছ থেকে প্রশ্নপত্রটি সংগ্রহ করেছিলেন বলে অভিযোগ। আর সেই ব্যক্তি প্রশ্নপত্রটি পেয়েছিলেন 'এনটিএ-এরই কোনও এক সূত্র' থেকে। চলতি মাসের শুরুর দিকে দিল্লির একটি আদালতে এমনই জানিয়েছে সিবিআই।

বর্তমানে এনটিএ-এর নিজস্ব জনবল অত্যন্ত সীমিত হওয়ায়, সংস্থাটি তাদের অধিকাংশ কাজই বাইরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করিয়ে থাকে। আর এই বিষয়টিই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বস্তুত, ২০২৪ সালে সংসদে দেওয়া একটি তথ্য অনুযায়ী, এনটিএ তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে মাত্র ২২ জন ডেপুটেশনে কর্মরত কর্মী, ৩৮ জন চুক্তিভিত্তিক কর্মী এবং ১৩৮ জন আউটসোর্সড বা বাইরের কর্মী নিয়ে। চুক্তিভিত্তিক কর্মী এবং বাইরের প্রতিষ্ঠানের ওপর এমন অত্যধিক নির্ভরতাই এই পরীক্ষা ব্যবস্থাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অরক্ষিত করে তোলে। আর ঠিক এই জায়গাতেই, এই শূন্যস্থান পূরণের লক্ষ্যে এগিয়ে এসেছে দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী।