আজকাল ওয়েবডেস্ক: রবিবার পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে বেরিয়েই এক্স হ্যান্ডেলে অনুভব গুপ্তা নামে এক ইউপিএসসি পরীক্ষার্থী প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন, "এবার কি সব ছেড়েছুড়ে এগিয়ে যাব, নাকি আর একটা শেষ চেষ্টা করব?" ২০২২ সাল থেকে দিল্লির বুকে টানা প্রস্তুতি নিচ্ছেন অনুভব। চার-চারটি প্রচেষ্টা শেষ করার পর রবিবারের পরীক্ষা যেন তাঁর মতো হাজারো তরুণ-তরুণীর স্বপ্নকে এক ধাক্কায় খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। অনুভব একা নন, ২৪ মে দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হওয়া সিভিল সার্ভিসেস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা দিয়ে বেরোনো প্রায় আট লাখ পরীক্ষার্থীর গলাতেই আজ একই হতাশার সুর। তাঁদের স্পষ্ট দাবি, সাম্প্রতিককালের মধ্যে সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর, ক্লান্তিকর এবং অপ্রত্যাশিত এক প্রশ্নপত্রের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁদের। বিশেষ করে সকালের জেনারেল স্টাডিজ (জিএস) পেপার ১ অনেককেই কাঁদিয়ে ছেড়েছে।

পরীক্ষার পরেই চণ্ডীগড়ের বিখ্যাত ইউপিএসসি মেন্টর ও 'স্লিপি ক্লাসেস'-এর প্রতিষ্ঠাতা শেখর দত্ত সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, এটি ইউপিএসসি-র ইতিহাসের অন্যতম কঠিন প্রিলিমস পরীক্ষা। পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, এবারের চ্যালেঞ্জটা শুধু তথ্য জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আসল সমস্যা ছিল, বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা এবং তীব্র মানসিক ও সময়ের চাপের মধ্যে সেই জটিল প্রশ্নের জাল কেটে সঠিক উত্তরটি বেছে নেওয়া। ছত্তিশগড়ের রায়পুরের আইএএস অফিসার অবনীশ শরণও এক্স-এ পোস্ট করে একে ‘আজ পর্যন্ত হওয়া কঠিনতম প্রিলিমস’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এমনকী, যাঁরা ইতিমধ্যেই সিভিল সার্ভিসে সফল হয়েছেন বা র‍্যাঙ্ক হোল্ডার, তাঁরাও এই প্রশ্নপত্র দেখে হতবাক হয়ে গেছেন। ইউপিএসসি-র নামের ফুল ফর্ম 'ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন' বদলে শিক্ষকেরা এখন ব্যঙ্গ করে বলছেন 'আনপ্রেডিটেবল পাবলিক সার্ভিস কমিশন' বা নজিরবিহীন অভাবনীয় এক কমিশন।

শিক্ষাবিদদের মতে, রবিবারের পরীক্ষার এই অদ্ভুত ধরণ আসলে কঠোর পরিশ্রম করা বহু ভালো ছাত্রছাত্রীকে এক লহমায় প্রতিযোগিতার বাইরে ঠেলে দিয়েছে। কারণ এবারের মূল সমস্যা প্রশ্নের কাঠিন্য নয়, বরং ছিল প্রশ্নপত্রের অস্বাভাবিক দৈর্ঘ্য। আগে যেখানে ১০০টি প্রশ্নের জন্য পুরো প্রশ্নপত্রটি ৪০ পাতার মতো হতো, এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬ পাতায়! কিছু কিছু পাতায় মাত্র দুটি করে প্রশ্ন ছিল। অর্থাৎ, একটি মাত্র মাল্টিপল চয়েস কোশ্চেন সমাধান করার জন্য পরীক্ষার্থীকে প্রায় অর্ধেক পাতা জুড়ে থাকা বিশাল টেক্সট পড়তে হয়েছে। এর ফলে পরীক্ষার্থীরা প্রশ্ন পড়ার পেছনেই সিংহভাগ সময় হারিয়ে ফেলেছেন, উত্তর ভাবার সময়টুকু মেলেনি। একজন পরীক্ষার্থী আক্ষেপ করে জানান, সব জানা থাকা সত্ত্বেও সময়ের অভাবে তিনি ১০০টির মধ্যে মাত্র ৬৬টি প্রশ্নের উত্তর ছুঁতে পেরেছেন। উত্তরপ্রদেশের এক সমাজকর্মী তো সমাজমাধ্যমে তীব্র কটাক্ষ করে লিখেছেন, যাঁরা এই প্রশ্ন তৈরি করেছেন, তাঁদের বসিয়ে দিলে হয়তো তাঁরা নিজেরাও ৩০টার বেশি উত্তর দিতে পারবেন না।

এরই মধ্যে, ইউপিএসসি-র ইতিহাসে এই প্রথমবার পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই একটি সাময়িক বা প্রোভিশনাল অ্যানসার কি (Answer Key) প্রকাশ করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে পরীক্ষার্থীরা কোনও  ভুল থাকলে আপত্তি জানাতে পারেন। তবে পরীক্ষা শেষ হওয়ার ১২ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও তা এখনও সামনে আসেনি।

দিল্লির মুখার্জি নগরের প্রবীণ ইউপিএসসি মেন্টর অনিল নারুলা একটি ভিডিও বার্তায় এই ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, প্রিলিমিনারি পরীক্ষা হল একটি বাছাই পর্ব (Screening Test)। এখানে প্রার্থীদের যোগ্যতা অবজেক্টিভ বা এমসিকিউ-এর মাধ্যমে যাচাই করার কথা। গভীর বা সাবজেক্টিভ মূল্যায়নের জন্য তো মেইনস (Mains) পরীক্ষা রয়েইছে। আগে থেকে কোনও  আভাস না দিয়ে কেন পরীক্ষার্থীদের এমন ‘কেস স্টাডি’র মতো দীর্ঘ প্রশ্নের মুখে ফেলা হল, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে, ২২ বছর বয়সী পরীক্ষার্থী রঞ্জন কুমার, যিনি পাটনা কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা দিতে এসেছিলেন, তিনি এতটাই ভেঙে পড়েছেন যে বলে ফেললেন, "আমার ট্রেনটা যদি লেট হতো, তবে অন্তত একটা অ্যাটেম্পট বেঁচে যেত।" তাঁর অভিযোগ, কিছু প্রশ্ন এমন ছিল যা প্রিলিমসের সিলেবাসে থাকারই কথা নয়, সেগুলি মেইনস-এর 'এথিক্স অ্যান্ড ইন্টিগ্রিটি' (Ethics and Integrity) বিষয়ের মতো দেখতে। যদিও কমিশন হয়তো একে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অংশ বলে চালিয়ে দিতে পারে।

দিল্লির আরেক বিখ্যাত শিক্ষক অমিত কিলহোর একে শুধু ‘কঠিন পরীক্ষা’ বলতে নারাজ। তাঁর মতে, কঠিন পরীক্ষা মানে সিলেবাসের ভেতরে থেকে গভীরতার পরিমাপ করা। কিন্তু রবিবার যা হয়েছে, তা আসলে খামখেয়ালিপনা। ইতিহাসের সিলেবাসে শুধু লেখা থাকে ‘ভারতের ইতিহাস ও জাতীয় আন্দোলন’—কিন্তু তার আড়ালে এমন অস্পষ্ট ও অদ্ভুত প্রশ্ন করা হবে, তার কোনো দিশা সিলেবাসে থাকে না।

গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যে সকালের জিএস পেপার এবং বিকালের সিএসএটি (CSAT) পেপারের ধকল সামলে যখন লাখ লাখ যুবক-যুবতী বাড়ি ফিরেছেন, তখন তাঁদের অনেকেরই চোখের কোণে জল আর ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা। কেউ ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন, কেউ বা সামাজিক মাধ্যমে মিম বানিয়ে নিজেদের দুঃখ ঢাকার চেষ্টা করছেন। তবে অনুভবের মতো যাঁরা জীবনের চার-পাঁচটি বছর এই একটা স্বপ্নের পেছনে বাজি রেখেছেন, তাঁদের কাছে এই তর্কবিতর্ক এখন অর্থহীন। ইউপিএসসি-র এই ‘অভাবনীয়’ এবং 'অপ্রত্যাশিত' রূপ প্রতি বছরই অগণিত স্বপ্নকে ভেঙে চুরমার করে দেয়, আর রবিবারের ২৫ মে-র সকালটা আরও একবার প্রমাণ করল যে, সিভিল সার্ভিসেসের লড়াইয়ে পরিশ্রমের চেয়েও বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে ভাগ্য এবং ঘড়ির কাঁটার সাথে এক অসম যুদ্ধ।