আজকাল ওয়েবডেস্ক: সম্প্রতি কোঝিকোড় জেলার পেরাম্ব্রা নির্বাচনী এলাকায় একটি রেস্তোরাঁর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী 'নিলাভিলক্কু' (প্রদীপ) জ্বালানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেরলে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন 'ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ (আইইউএমএল)'-এর প্রথম মহিলা বিধায়ক ফাতিমা তাহলিয়া।

এই ঘটনা কেরলের মুসলিম সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক তৈরি করেছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, মুসলিমরা (বিশেষ করে জনপ্রতিনিধিরা) অন্য ধর্মের ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন কি না, তা নিয়ে।

রাজ্যের সুন্নি-শাফি ঘরানার ইসলামি পণ্ডিতদের শীর্ষ সংগঠন 'সমাস্থা কেরল জামিয়্যাতুল উলামা' এই কাজের সমালোচনা করেছে।

বিষয়টি নিয়ে আলোচনার পর এক বিবৃতিতে 'সমাস্থা সেন্ট্রাল মুশাওয়ারা' জানিয়েছে যে, মুসলিমদের এমন সব অনুষ্ঠান বা প্রথায় অংশগ্রহণ করা উচিত নয় যা ইসলামি শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি এবং যা অন্য ধর্মের অনুসারীরা তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পালন করে থাকেন।

সংগঠনটি উল্লেখ করেছে যে, ঐতিহাসিকভাবেই অ-মুসলিমদের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় আচার হিসেবে 'নিলাভিলক্কু' জ্বালানোর প্রথা প্রচলিত রয়েছে। তাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার পাশাপাশি মুসলিমদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এই বিতর্ক প্রসঙ্গে 'সমাস্থা'-এর নেতা আব্দুল হামিদ ফাইজি আম্বালাক্কাদাভু একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে সংগঠনের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, ইসলাম অন্য ধর্মের মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ও সহনশীলতা বজায় রাখতে উৎসাহিত করে। কিন্তু ধর্মীয় রীতিনীতি বা প্রথা গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট সীমারেখা রয়েছে।

সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ফাইজি বলেন, "ইসলামি বিধান অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট, স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। ইসলাম বিশ্বাসীদের অন্য ধর্মের অনুসারীদের প্রতি বন্ধুত্ব ও সহনশীলতা প্রদর্শনের কঠোর নির্দেশ দেয়। মহানবী (সা.)-এর সাহাবীরা তাঁদের পরিবারকে নির্দেশ দিতেন যে, যখন কোনোও ছাগল জবাই করে রান্না করা হত, তখন তার প্রথম অংশটি যেন কোনও ইহুদি প্রতিবেশীকে দেওয়া হয়।" তিনি আরও যোগ করেন, "তবে, অন্য ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান অনুসরণ ও পালন করার বিষয়ে ইসলাম কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।"

'সেন্ট্রাল মুশাওয়ারা'-র নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে ফাইজি জানান, বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং এই বিষয়ে সংগঠনের স্পষ্ট অবস্থান জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "যদি কোনও মুসলিম এমন কোনও প্রথায় অংশ নেন এবং সেই প্রথা পালনকারীদের বিশ্বাস (যা ইসলামের পরিপন্থী) তা মেনে নিয়ে বা তার ওপর ভিত্তি করে কাজটি করেন, তবে সেই কাজ ইসলাম থেকে বিচ্যুত হওয়ার শামিল বলে গণ্য হবে।" এতে আরও বলা হয়েছে-"অন্যদিকে, যদি এমন কোনও বিশ্বাসকে গ্রহণ বা ভিত্তি না করে (বরং কেবল অমুসলিমদের অনুকরণ করার উদ্দেশ্যে) এই কাজটি করা হয়, তবে তা নিষিদ্ধ ও পাপপূর্ণ।"

তবে সংস্থাটি স্পষ্ট করেছে যে, শুধুমাত্র আলো পাওয়ার উৎস হিসেবে 'নিলাভিলক্কু' (প্রথাগত প্রদীপ) ব্যবহার করা বৈধ।

পাশাপাশি, সামাজিক সম্প্রীতি ও সাম্প্রদায়িক ঐক্য বজায় রেখে এই ধরনের বিষয়গুলি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করার জন্য তারা জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়া
এদিকে, আইইউএমএল-এর বিধায়কের প্রদীপ জ্বালানোর ঘটনায় 'সমাস্থা'-র আপত্তি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের ভাল লাগেনি। তাঁদের অনেকের মতে, এই আচার পালন করা ইসলামের পরিপন্থী নয়।

ফেসবুক ব্যবহারকারী সিরাজুদ্দিন শেখ লিখেছেন, "উদ্বোধনী প্রদীপ জ্বালানো মোটেও হারাম নয়। ভারতের অনেক মসজিদেও আমি এমন প্রদীপ দেখেছি। একজন মুসলিম নারী এই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন বলে মুসলমানদের গর্বিত হওয়া উচিত।" ওমায়ের আলম নামে একজন লিখেছেন, "প্রদীপ জ্বালানো কবে থেকে ইসলামবিরোধী হয়ে গেল? মানে, যা-তা একটা কথা!"

অন্য অনেক ব্যবহারকারীও মত দিয়েছেন যে, এই বিশেষ আচারটিকে কারও জন্যই নিষিদ্ধ বা 'ট্যাবু' হিসেবে দেখা উচিত নয়, কারণ অনেক মসজিদ ও দরগাহেও প্রদীপ জ্বালানো হয়ে থাকে।

ফাতিমা তাহলিয়া কে?
ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ-এর টিকিটে কেরল বিধানসভায় নির্বাচিত প্রথম মহিলা বিধায়ক হয়ে ফাতিমা তাহলিয়া। পেশায় আইনজীবী ফাতিমা কোঝিকোড় ল' কলেজে 'মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশন'-এর মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে এমএসএফ-এর মহিলা শাখা 'হারিতা'-র একজন বিশিষ্ট নেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

ফাতিমা তাহলিয়া এর আগে এমএসএফ-এর জাতীয় সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি 'ইউথ লিগ'-এর একজন পদাধিকারী। এছাড়া তাহলিয়া কোঝিকোড় কর্পোরেশনের কুট্টিচিরা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিসেবেও প্রতিনিধিত্ব করছেন ফাতিমা।

পেরাম্বরায় ফাতিমা তাহলিয়ার নির্বাচনী জয় ছিল এক বড় রাজনৈতিক অঘটন। বামপন্থীদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই নির্বাচনী এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ফাতিমা সিপিআইএম-এর প্রবীণ নেতা ও প্রাক্তন মন্ত্রী টিপি রামাকৃষ্ণানকে ৫,০৮৭ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।

এই ফলাফল পেরাম্বরায় সিপিআইএম-এর আধিপত্য ধসে পড়ে। উল্লেখ্য, রামাকৃষ্ণান এর আগের দু'টি নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন এবং গত বিধানসভা নির্বাচনে ২২,০০০-এরও বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছিলেন।