আজকাল ওয়েবডেস্ক: উত্তরাখণ্ডের কোটদ্বারে সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঘটনায় দীপক নামের এক সাধারণ নাগরিককে আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। পুলিশি অবস্থান, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং নাগরিক সমাজের উদ্বেগ মিলিয়ে এই ঘটনা ক্রমশই বৃহত্তর এক প্রশ্নের প্রতীক হয়ে উঠছে—সাম্প্রদায়িক হিংসা ঠেকাতে এগিয়ে এলে কি সাধারণ মানুষই অপরাধী হয়ে যাবে?

ঘটনার প্রেক্ষিতে উত্তরাখণ্ড পুলিশের সিনিয়র সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ (এসএসপি) সর্বেশ পওয়ার স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, দীপকের বিরুদ্ধে যে ধারাগুলি প্রয়োগ করা হয়েছে, সেগুলির আওতায় গ্রেপ্তারের কোনও বিধান নেই। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পুলিশ কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে টার্গেট করছে না। “আমাদের মূল উদ্দেশ্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং শান্তি বজায় রাখা,” বলেন এসএসপি পওয়ার। তাঁর দাবি, উত্তেজনা যাতে আর না বাড়ে এবং সামাজিক বিভাজন তৈরি না হয়, সে জন্য প্রশাসন সব পক্ষের সঙ্গেই নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।

তবে বাস্তবে দীপককে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে টেনে আনার সিদ্ধান্ত ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকের মতে, এই পদক্ষেপ সাম্প্রদায়িক হিংসা প্রতিরোধে এগিয়ে আসা নাগরিকদের অপরাধী বানানোর এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করছে।

এই প্রসঙ্গে রবিবার কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ একটি কড়া বার্তা দেন। তিনি প্রকাশ্যে দীপকের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে “ভারতের নায়ক” বলে আখ্যা দেন। রাহুল গান্ধী লেখেন, দীপক হলেন “ঘৃণার বাজারে ভালোবাসার দোকান”—একটি শব্দবন্ধ, যা তিনি দীর্ঘদিন ধরেই নিজের রাজনৈতিক দর্শনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন।

রাহুল গান্ধীর কথায়, “উত্তরাখণ্ডের দীপক সংবিধান ও মানবতার জন্য লড়াই করছে।” তিনি বিজেপি ও সংঘ পরিবারকে সরাসরি অভিযুক্ত করে বলেন, তারা পরিকল্পিতভাবে সাংবিধানিক মূল্যবোধ দুর্বল করার চেষ্টা করছে। তাঁর অভিযোগ, আরএসএস-ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলি ইচ্ছাকৃতভাবে “অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষ” ছড়িয়ে দেশকে বিভক্ত রাখছে, যাতে ভয় দেখিয়ে শাসন চালানো যায়। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, উত্তরাখণ্ড সরকার কার্যত সেই “অসামাজিক শক্তি”-গুলিকে মদত দিচ্ছে, যারা সাধারণ মানুষকে হেনস্তা করছে।

“ঘৃণা, ভয় আর নৈরাজ্যের পরিবেশে কোনও দেশ এগোতে পারে না,” লেখেন রাহুল গান্ধী। তাঁর মতে, শান্তি ছাড়া উন্নয়ন শুধু একটি ফাঁপা স্লোগান। তিনি আরও যোগ করেন, “আমাদের আরও এমন প্রদীপ দরকার—যারা মাথা নত করে না, ভয় পায় না, এবং সংবিধানের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়।”

এদিকে দীপকের ব্যক্তিগত জীবনেও এই ঘটনার গভীর প্রভাব পড়েছে। তিনি অনলাইন হেনস্থা, হুমকি এবং তাঁর বাড়ি ও কর্মস্থলের বাইরে ভিড় জমার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। তবুও, দীপক জানিয়েছেন, তিনি তাঁর অবস্থান থেকে সরে আসবেন না। তাঁর ঘনিষ্ঠদের দাবি, ঘটনার দিন পরিস্থিতি যখন সহিংসতার দিকে এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল, তখনই তিনি সাহস করে এক বৃদ্ধ দোকানদারকে ভিড়ের মধ্য থেকে টেনে বের করে আনেন—সম্ভাব্য রক্তপাত ঠেকাতেই তাঁর এই পদক্ষেপ।

কোটদ্বারে এখনও পুলিশি নজরদারি জারি রয়েছে এবং তদন্ত চলছে। তবে এই ঘটনা আর শুধু একটি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ক্রমশই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং একটি ধর্মনিরপেক্ষ সমাজে সাধারণ মানুষের নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে বলার অধিকার—এই সব কিছুর প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠছে, সংবিধান ও মানবতার পক্ষে দাঁড়ানো কি আজকের ভারতে অপরাধ হয়ে যাচ্ছে? দীপকের ঘটনা সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নটাই আরও জোরালোভাবে সামনে এনে দিয়েছে।