আজকাল ওয়েবডেস্ক: দিল্লির তীব্র দাবদাহে জ্বলছে পিচ, ফুটপাথেই দুপুরের ভাত খাচ্ছেন ২৫ বছরের আরবাজ। মাথার ওপর একটু টিনের ছাউনি নেই, তেষ্টা মেটাতে নেই এক ফোঁটা ঠান্ডা জল। কারণ, কুইক-কমার্স সংস্থা ‘জেপ্টো’ (Zepto)-র কাছে তাঁর কোনও  ‘অফিস’ নেই, তিনি স্রেফ একজন 'ডেলিভারি পার্টনার' বা গিগ ওয়ার্কার। ২০২৬ সালের ২৩ মে, শনিবার দুপুর ১টায় দিল্লির কালকাজি (গোবিন্দপুরী) মেট্রো স্টেশনের বাইরে বাইকের তপ্ত সিটটুকুই তাঁর বসার জায়গা।

ফোনে অ্যাপের ‘ডিং’ আওয়াজ হলেই আইসক্রিম বা ওষুধ পৌঁছে দিতে ১০ মিনিটে ছুটতে হয় লজিস্টিকসের অন্ধকার গুদাম বা 'ডার্ক স্টোর' থেকে। গরমের পারদ ৪৩ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে, কিন্তু বিশ্রাম নেওয়ার জো নেই। এই চরম তাপপ্রবাহের মধ্যে লাখ লাখ গিগ শ্রমিকের বাস্তব অবস্থা খতিয়ে দেখতে ‘দ্য ওয়ার’ (The Wire)-এর সাংবাদিক নিজেই জেপ্টো, ব্লিনকিট (Blinkit) এবং সুইগি ইনস্টামার্ট (Swiggy Instamart)-এ ডেলিভারি বয় হিসেবে নাম নথিভুক্ত করেছিলেন।

নথিভুক্তকরণের সময় প্যান কার্ডের মতো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা নেওয়া হলেও, দিল্লির এই ভয়ঙ্কর লু এবং হিটওয়েভ নিয়ে কোনও  সংস্থাই চালকদের কোনও  সতর্কতা বা গাইডলাইন দেয়নি। ২২ মে বিকেল সাড়ে ৪টেয় কালকাজির সুইগি ইনস্টামার্ট আউটলেটের বাইরে দেখা যায়, ৪০ ডিগ্রির বেশি গরমে মাত্র ৪ জন বসার মতো একটি বেঞ্চ রয়েছে, বাকিরা খোলা আকাশের নিচেই দাঁড়িয়ে। সুইগি অ্যাপে লগ-ইন করার মাত্র দু-মিনিটের মধ্যে ৩.৩ কিলোমিটার দূরের প্রথম অর্ডার আসে, যার জন্য মেলে মাত্র ২৯ টাকা! পরের ০.৮ কিলোমিটারের অর্ডারের জন্য দেওয়া হয় মাত্র ১৫ টাকা। প্রায় ১ ঘণ্টা বাইক চালিয়ে ৪৪ টাকা আয় হলেও, সেই টাকা দিয়ে এক বোতল ঠান্ডা জল কেনার সামর্থ্য থাকে না। অথচ আউটলেটে যে জল দেওয়া হচ্ছিল, তা গরমে ফুটন্ত স্যুপের মতো গরম হয়ে গিয়েছিল।

সংস্থাগুলোর দাবি আর বাস্তবের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। সুইগি দাবি করেছে তারা ফুড ডেলিভারি বয়দের জন্য কুলিং ভেস্ট ও গ্লুকোজ দিচ্ছে, কিন্তু ইনস্টামার্টের মুদি পণ্য সরবরাহকারীদের জন্য ডেজার্ট কুলার বসানোর কাজ এখনও শেষ হয়নি। অন্যদিকে জেপ্টো-র সিওও বিকাশ শর্মা বিশ্রামাগার ও ঠান্ডা জলের বড় বড় দাবি করলেও কালকাজি ও জসোলা আউটলেটের বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। কালকাজির জেপ্টো আউটলেটের একমাত্র কুলারটিতে জল না থাকায় গরম হাওয়া বেরোচ্ছিল, আর টয়লেটটি ছিল অত্যন্ত নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত। জসোলা আউটলেটের ডেলিভারি পার্টনার শাহবাজ হুসেন ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “এখানে বসার জায়গা বা ফ্যান-কুলার কিছুই নেই, নিজেদের টাকা দিয়ে জল কিনে খেতে হয়। উল্টে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকার জন্য স্থানীয়দের গালিগালাজ ও মারধরও খেতে হয়।”

এরই মধ্যে ২৩ মে দিল্লিতে পেট্রোলের দাম বেড়ে লিটার প্রতি প্রায় ১০০ (৯৯.৫১) টাকা হয়েছে। ডেলিভারি করে ১ ঘণ্টায় যে ৯৪ টাকা আয় হয়, তা দিয়ে এক লিটার তেলও কেনা যায় না। অনেকে ৩০০ টাকা রোজকার ভাড়ায় ইলেকট্রিক স্কুটার চালান। দিনে ১২ ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনির পর তেল খরচ ও ভাড়া বাদ দিয়ে দিনশেষে মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা হাতে থাকে, যা দিয়ে কোনও  রকমে সংসার চলে। ব্লিনকিটের করোল বাগ আউটলেটেও একই দশা, সেখানে কোনও  বসার জায়গা নেই। ব্লিনকিটের কর্মী মহম্মদ আবরার জানান, “গরমে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, অথচ সময়মতো গ্লুকোজটুকুও দেওয়া হয় না। উল্টে গরমকালে আমাদের পেমেন্ট আরও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি রয়েছে মানসিক ও আর্থিক লাঞ্ছনা। কালকাজির জেপ্টো কর্মী অঙ্কিত যাদব বলেন, “এই গরমে ৪-৫ তলায় ভারী ওজন নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। স্টোর থেকে কোনও  জিনিস কম গেলে বা ভুল হলে আমাদের পেমেন্ট থেকে টাকা কাটা হয়।” দিল্লির এই গিগ অর্থনীতির সিংহভাগ কর্মীই উত্তরপ্রদেশ, বিহার বা পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্য থেকে আসা পরিযায়ী শ্রমিক বা পার্ট-টাইম পড়ুয়া। তাঁদের মধ্যেই একজন ৫৪ বছর বয়সী রাজকুমার মণ্ডল, যিনি পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসে দিনের মূল কাজের পর রাতেও জেপ্টো-তে খাটছেন। বয়সের ভারে ক্লান্ত রাজকুমারবাবুর কথায়, “সব জিনিসের দাম বেড়ে গেছে, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাতে এই বয়সেও রাতের অন্ধকারে জল-বিশ্রাম ছাড়াই ছুটতে হচ্ছে।” ভারতের প্রায় ৭৭ লাখ গিগ শ্রমিকের এটাই রোজকার জ্বলন্ত বাস্তব।