আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য বর্তমানে যে 'কমন ইউনিভার্সিটি এন্ট্রান্স টেস্ট' বা 'CUET' পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে এবার বড়সড় প্রশ্ন তুলল সংসদের স্থায়ী কমিটি। কমিটির মতে, শুধুমাত্র 'মাল্টিপল চয়েস কোয়েশ্চেন' বা এমসিকিউ (MCQ) ধাঁচের প্রশ্ন দিয়ে সমাজবিজ্ঞান বা কলা বিভাগের মতো বিষয়গুলির সঠিক মূল্যায়ন করা কখনওই সম্ভব নয়। গত ১৬ জুন রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেওয়া একটি রিপোর্টে শিক্ষা, নারী, শিশু, যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক ওই কমিটি সাফ জানিয়েছে, যে বিষয়গুলি মূলত স্বাধীন ও নিজস্ব চিন্তাধারার ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এই এমসিকিউ পদ্ধতি একেবারেই বেমানান। এর ফলে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) মতো প্রতিষ্ঠানগুলি নিজেদের ভর্তির ক্ষেত্রে আর্থ-সামাজিক ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্য বজায় রাখতে গিয়ে প্রবল বাধার মুখে পড়ছে।

কংগ্রেস সাংসদ দিগ্বিজয় সিংয়ের নেতৃত্বাধীন এই প্যানেল মূলত উচ্চশিক্ষা দপ্তরের ২০২৫-২৬ সালের অনুদানের দাবি সংক্রান্ত আগের একটি রিপোর্টের (৩৬৪তম) সূত্র ধরেই এই নতুন পর্যবেক্ষণটি সামনে এনেছে। ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে পরীক্ষা চালু হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, পড়ুয়াদের ওপরে চাপ কমানো এবং বিভিন্ন বোর্ডের ছাত্রছাত্রীদের সমান সুযোগ করে দেওয়া। কিন্তু এমসিকিউ পদ্ধতি সেই মূল উদ্দেশ্যের পথেই কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই প্যানেল জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-র (NEP) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মান ও ধরন নতুন করে খতিয়ে দেখার কড়া সুপারিশ করেছে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রবেশিকা পরীক্ষা এমনভাবেই তৈরি ছিল, যাতে সব স্তরের ও প্রান্তের ছেলেমেয়েরা সেখানে পড়ার সুযোগ পায়। কিন্তু এই কেন্দ্রীভূত পরীক্ষার ফলে জেএনইউ-এর সেই আইনি ও অ্যাকাডেমিক ঐতিহ্য ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলে প্যানেল মনে করছে।

তবে এই বিষয়ে সরকারের নিজেদের যুক্তিও রয়েছে। সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, CUET আসলে পড়ুয়াদের জন্য একটিমাত্র জানালা খুলে দিয়েছে, যার ফলে একটি পরীক্ষা দিয়েই তারা একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে। সরকার আরও দাবি করেছে যে, আগের তিন বছরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবারের পরীক্ষায় বেশ কিছু রদবদল করা হয়েছে। বিষয়ের সংখ্যা ৬৩ থেকে কমিয়ে ৩৭ করা হয়েছে এবং ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে তিন সপ্তাহ আগেই পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে পরীক্ষার ব্যবস্থাপনা আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে।

শুধু পরীক্ষা পদ্ধতিই নয়, জেএনইউ-তে শিক্ষকদের পদোন্নতি আটকে থাকা নিয়েও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে কমিটি। রিপোর্টে বলা হয়েছে, যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও প্রায় ৩০ জন শিক্ষক এখনও সহকারী অধ্যাপক বা অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পদে আটকে আছেন এবং প্রায় ৫০ জন অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবেই কাজ করে যাচ্ছেন, যাঁদের অনেক আগেই প্রফেসর হওয়ার কথা ছিল। আরও ৩০ জন শিক্ষক অ্যাসিস্ট্যান্ট থেকে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছেন। সরকার জানিয়েছে যে 'কেরিয়ার অ্যাডভান্সমেন্ট স্কিম'-এর অধীনে এই কাজগুলি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু কমিটি এই সাধারণ জবাবে সন্তুষ্ট নয়। তারা জেএনইউ-এর নির্দিষ্ট সমস্যাটি দ্রুত সমাধানের নির্দেশ দিয়েছে, যাতে যোগ্য প্রার্থীরা সময়মতো তাঁদের প্রাপ্য পদোন্নতি পান।

এর পাশাপাশি, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য সেন্ট স্টিফেন্স কলেজের শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির বিতর্ক নিয়েও সরব হয়েছে প্যানেল। ২০২২ সাল থেকে এই প্রক্রিয়া আটকে থাকায় সেখানে ৩০টিরও বেশি পদ খালি পড়ে আছে। এই আইনি জট দ্রুত কাটানোর পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় অনুদানপ্রাপ্ত সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এখন থেকে পড়ুয়াদের লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম, শহর-গ্রাম এবং শ্রেণিগত বিন্যাসের একটি বার্ষিক রিপোর্ট জমা দেওয়ারও সুপারিশ করেছে কমিটি।

সবশেষে, ভারতের প্রাচীনতম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি— যেমন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বম্বে, মাদ্রাজ, দিল্লি, এলাহাবাদ এবং ডঃ হরি সিং গৌর ইউনিভার্সিটির মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলির সার্বিক উন্নয়নে বিশেষ নজর দেওয়ার কথা বলেছে কমিটি। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া 'ইনস্টিটিউট অফ এমিনেন্স' স্কিমের মেয়াদ বাড়িয়ে বা নতুন কোনও প্রকল্পের মাধ্যমে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে বিশ্বমানের গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যেই এই মর্যাদা পেয়েছে, আর বাকি আর্থিক অনুদানের বিষয়গুলি নিয়ে ভবিষ্যতে আলোচনা করা হবে। আপাতত কমিটির এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এবং ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (NTA) নজরে আনা হয়েছে।