আজকাল ওয়েবডেস্ক: সোমবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন ফলপ্রসূ করার আহ্বান জানান। তিনি আইনপ্রণেতাদের তথ্য-ভিত্তিক ও অর্থবহ বিতর্কে অংশ নেওয়ার অনুরোধ করেন এবং জোর দিয়ে বলেন যে, ভারতের দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও মহাকাশ গবেষণায় সাম্প্রতিক সাফল্য দেশের যুবশক্তির অসীম সম্ভাবনারই প্রতিফলন।
'স্কাইরুট অ্যারোস্পেস'-এর 'বিক্রম-১' উৎক্ষেপণের নেপথ্যে থাকা তরুণ দলের প্রশংসা করার সময় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে লক্ষ্য করে প্রধানমন্ত্রী মোদি পরোক্ষে বেনজির কটাক্ষ করেন। তিনি বলেন, তিনি "৫৬ বছর বয়সী কোনও যুবকের কথা" বলছেন না।
মহাকাশ গবেষণায় ভারতের বেসরকারি খাতের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী মোদি 'বিক্রম-১'-এর সফল উৎক্ষেপণের জন্য 'স্কাইরুট অ্যারোস্পেস'-এর প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, এই সাফল্য ভারতের তরুণ উদ্ভাবকদের অসামান্য প্রতিভারই প্রমাণ। তিনি উল্লেখ করেন যে, ওই স্টার্টআপের দলের সদস্যদের গড় বয়স ছিল মাত্র ২৮ বছর। প্রধানমন্ত্রীর কথায়, "ভারতের যুবসমাজ মহাকাশে এক নতুন যাত্রার সূচনা করেছে। আমাকে জানানো হয়েছে যে, 'স্কাইরুট' স্টার্টআপে কর্মরত পুরো দলের গড় বয়স মাত্র ২৮ বছর। এমন তরুণরাই এই কৃতিত্ব অর্জন করেছে।"
এরপর প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক মন্তব্য করেন। বলেন, "আমি ৫৬ বছর বয়সী কোনও যুবকের কথা বলছি না।" যা কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে উদ্দেশ্য করেই করা হয়েছিল বলে মনে করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তরুণ ভারতীয়দের এই সাফল্য বিশ্বমঞ্চে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে এবং সারা বিশ্বে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলছে। তিনি বলেন, "মাত্র এক মাসের মধ্যে দেশ অনেকগুলো মাইলফলক স্পর্শ করেছে। জাতীয় পর্যায় হোক, আন্তর্জাতিক অঙ্গন কিংবা এখন মহাকাশ, সবক্ষেত্রেই এই মুহূর্তগুলো ভারতের জন্য অত্যন্ত গর্বের।"
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, গত বর্ষাকালীন অধিবেশনের ঠিক আগেই একজন ভারতীয় মহাকাশচারী আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে গিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, ভারতের একটি বেসরকারি স্টার্টআপের এই সাম্প্রতিক সাফল্য আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। মোদির কথায়, "বিশ্বমঞ্চে ভারতের পরিচিতি সর্বজনীন স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করছে। এটি কোনও কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটি এক শক্তিশালী বার্তা, যে আমাদের দেশের যুবশক্তির সম্ভাবনা ও আকাঙ্ক্ষা মহাকাশের মতোই অসীম।"
সংসদের অধিবেশন ‘ফলপ্রসূ’ হবে বলে আশা প্রকাশ করলেন প্রধানমন্ত্রী মোদি
বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর আগে সাংবাদিকদের উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, সংসদ সুষ্ঠুভাবে কাজ করবে এবং এমন একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে যেখানে প্রত্যেকের কথা শোনার সুযোগ থাকবে। বর্ষাকাল ও সংসদের মধ্যে তুলনা টেনে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, দেশের কল্যাণের জন্য উভয়কেই ‘সক্রিয় ও ফলপ্রসূ’ হতে হবে। তিনি বলেন, “বর্ষাকাল হোক বা সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন, উভয়ই যদি সক্রিয় হয়, তবে তা অত্যন্ত ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়। আর যখন উভয়ই ফলপ্রসূ হয়, তখন তা জাতির কল্যাণ ও সমস্ত জীবের মঙ্গলের পথ প্রশস্ত করে। তাই আমরা প্রার্থনা করি যেন বর্ষাকাল সক্রিয় ও ফলপ্রসূ থাকে এবং সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনও ফলপ্রসূ হয়।”
প্রধানমন্ত্রী জানান, বিশ্বজুড়ে নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও গত এক মাসে দেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। তিনি আস্থা প্রকাশ করেন যে, ভারতের উন্নয়ন যাত্রায় সংসদ নতুন গতি সঞ্চার করতে পারবে।
ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ওপর আলোকপাত করলেন প্রধানমন্ত্রী
পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত এবং বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চিত পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, অন্যান্য প্রধান অর্থনীতির তুলনায় ভারত ভাল ফলাফল অব্যাহত রেখেছে। তাঁর দাবি, “যুদ্ধ ও কঠিন পরিস্থিতি সত্ত্বেও ভারত ৭.৭ শতাংশ বৃদ্ধির হার নিয়ে দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।” তিনি বলেন, দেশের অগ্রগতির গতি বেড়েছে এবং সংসদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা সেই গতিকে আরও জোরদার করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী মোদি সংসদে বিতর্কের সুযোগ দেওয়ার ওপরও জোর দে। বিশেষ করে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত ও তরুণ সাংসদদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি তিনি তুলে ধরেন।
“সংসদে তরুণ ও নতুন সাংসদদের কণ্ঠস্বর প্রয়োজন।”
সুস্থ গণতান্ত্রিক আলোচনার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে তিনি আরও বলেন, “যদি আপনার যুক্তি ও তথ্য জোরালো হয়, তবে আপনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আপনার কথা তুলে ধরতে পারেন। প্রত্যেকের কথা শোনার সুযোগ থাকা উচিত।”
গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বিল পেশের উদ্যোগ সরকারের
১৩ আগস্ট পর্যন্ত চলবে এই বর্ষাকালীন অধিবেশনে। এবার ব্যাপক আইনি কার্যক্রম সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারের সম্ভাব্য কার্যসূচি অনুযায়ী, ‘ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’-কে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে; এই বিলের মাধ্যমে বিদেশি অনুদান সংক্রান্ত আইনটিতে পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। যৌথ সংসদীয় কমিটির পর্যালোচনার পর উচ্চশিক্ষার কাঠামো সংস্কারের লক্ষ্যে ‘বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান বিল, ২০২৫’ উত্থাপনের বিষয়টিও কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।
সংসদে উত্থাপনের জন্য তালিকাভুক্ত নতুন আইনগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘আয়কর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, নির্দিষ্ট কিছু সরকারি সিকিউরিটির ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কর ছাড়ের মেয়াদ বর্ধিতকারী একটি অধ্যাদেশের স্থলাভিষিক্ত করাই এই বিলের উদ্দেশ্য।
এছাড়া সরকার ‘সুপ্রিম কোর্ট (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এর জন্য সংসদের অনুমোদন চাইবে। ক্রমবর্ধমান মামলার জট মোকাবিলার লক্ষ্যে এই বিলে ভারতের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকের অনুমোদিত সংখ্যা ৩৩ থেকে বাড়িয়ে ৩৭ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আইনের মধ্যে রয়েছে ‘ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ উন্নয়ন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন’-এ সংশোধনী এবং ‘জাতীয় সম্মান অবমাননা প্রতিরোধ আইন’-এ পরিবর্তন।
সরকার যখন গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং বিরোধী দলগুলো বেশ কিছু বিতর্কিত বিষয় উত্থাপনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, তখন আসন্ন সপ্তাহগুলোতে সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনে তীব্র বিতর্কের সম্ভাবনা রয়েছে।















