আজকাল ওয়েবডেস্ক: পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান সংঘাতের প্রেক্ষিতে মাসুদ পেজেশকিয়ান ভারতের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে BRICS গোষ্ঠী বর্তমান সংকট মোকাবিলায় একটি “দৃঢ় ও গঠনমূলক ভূমিকা” পালন করে। বর্তমানে এই জোটের সভাপতিত্ব করছে ভারত। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) রাতে পেজেশকিয়ান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে টেলিফোনে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা Mehr News Agency–র প্রকাশিত বিবরণে বলা হয়েছে, আলোচনায় ইরানের প্রেসিডেন্ট ভারতের কাছে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত প্রশমনে ব্রিকসের সক্রিয় ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
একই রাতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর–এর মধ্যেও ফোনে কথা হয়। ফেব্রুয়ারি ২৮ থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের পর এটাই ছিল তাঁদের চতুর্থ আলোচনা। জয়শঙ্কর পরে সামাজিক মাধ্যমে জানান, এই আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক বিষয়ের পাশাপাশি ব্রিকস সংক্রান্ত বিষয়ও উঠে এসেছে।
ইরানের বিবরণ অনুযায়ী, পেজেশকিয়ান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের “ভারসাম্যপূর্ণ ও গঠনমূলক অবস্থান”–এর প্রশংসা করেন এবং উত্তেজনা কমানোর ক্ষেত্রে ভারতের প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধ শুরু করেনি এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ারও কোনও ইচ্ছা নেই। তবে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করেই তারা অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। মোদি আলোচনায় পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বলেন, ভারত ইরানকে “বন্ধু দেশ” হিসেবেই দেখে। তিনি জানান, কূটনৈতিক সমাধান এগিয়ে নিতে ভারত সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, কারণ সংঘাত বৃদ্ধি কোনও পক্ষের স্বার্থে নয়।
ইরানের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ইরানের পরিকাঠামোর উপর হামলা হলেও ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে তেহরান আগ্রহী। তিনি উল্লেখ করেন যে Shanghai Cooperation Organisation–এর মতো বহুপাক্ষিক কাঠামোর পাশাপাশি ব্রিকসের মাধ্যমেও সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে। তাঁর মতে, পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ব্রিকসকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচিও একই বার্তা দেন। তিনি বলেন, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলিকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের নিন্দা করা উচিত এবং ব্রিকসকে বহুপাক্ষিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে “গঠনমূলক ভূমিকা” পালন করতে হবে।
এই সংঘাতের ফলে হরমুজ প্রণালীতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যা ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ভারত যে তেল আমদানি করে তার বড় অংশই উপসাগরীয় দেশগুলি—ইরাক, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহী—থেকে আসে এবং এই সরবরাহের বড় অংশ হরমুজ প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হয়। সংঘাত শুরুর পর থেকে প্রণালী প্রায় বন্ধ হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহেও চাপ তৈরি হয়েছে। ভারত তার এলপিজি চাহিদার প্রায় ৬২ থেকে ৬৫ শতাংশ আমদানি করে এবং ২০২৪ সালে সেই আমদানির ৯০ শতাংশেরও বেশি পশ্চিম এশিয়া থেকে হরমুজ প্রণালী হয়ে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে দেশে এলপিজি সরবরাহে চাপ পড়েছে, বিশেষ করে রেস্তোরাঁ ও আতিথ্য শিল্পে।
এদিকে কেন্দ্রীয় সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে তেল ও গ্যাস মন্ত্রকের মাধ্যমে তেল শোধনাগারগুলিকে নির্দেশ দিয়েছে, যাতে বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের পরিবর্তে গৃহস্থালির রান্নার গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। পাশাপাশি Essential Commodities Act প্রয়োগ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি সংসদে জানিয়েছেন, ভারত তার অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশ বিকল্প রুটে সরিয়ে নিয়েছে এবং দেশের ভোক্তাদের জন্য জ্বালানির ঘাটতি নেই।
সংঘাতের প্রভাব পড়েছে ভারতীয় নাবিকদের উপরও। সাম্প্রতিক হামলায় তিনজন ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন এবং একজন এখনও নিখোঁজ। আরও দুই ডজনের বেশি নাবিক আহত হয়েছেন। বুধবার বাসরার কাছে একটি মার্কিন মালিকানাধীন তেলবাহী জাহাজে হামলায় এক ভারতীয় নাবিক নিহত হন। ভারতের নৌপরিবহণ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পারস্য উপসাগর অঞ্চলে ২৮টি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে ২৪টি জাহাজ, যেখানে ৬৭৭ জন নাবিক রয়েছেন, হরমুজ প্রণালীর পশ্চিমে অবস্থান করছে এবং আরও চারটি জাহাজ ১০১ জন নাবিকসহ প্রণালীর পূর্বদিকে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইরান–ভারত যোগাযোগ বাড়ছে এবং ব্রিকসের মাধ্যমে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।
