আজকাল ওয়েবডেস্ক: সরকারি অডিটে বড় বেনিয়ম ধরা পড়ল। মহারাষ্ট্রের সরকারি সামাজিক প্রকল্ 'মুখ্যমন্ত্রী মাঝি লাড়কি বহিন যোজনা' থেকে বাতিল হয়েছে ১০ লক্ষ মহিলা। বাতিলদের বেশিরভাগেরই পারিবারিক আয় নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি ছিল বলে অডিটে জানা গিয়েছে।
ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি)-র সাংসদ সুপ্রিয়া সুলের অভিযোগ, ১.২৫ কোটিরও বেশি মহিলাকে এই কল্যাণমূলক প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি সরকারের যাচাইকরণ প্রক্রিয়া এবং সরকারি তহবিলের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। সেদিনই এই বাতিলের বিষয়টি সামনে এল। তবে রাজ্য সরকার জানিয়েছে যে, এই বাদ পড়ার ঘটনাগুলি ছিল একটি বিস্তারিত যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার ফলাফল। এই যাচাই-বাছাই-এর লক্ষ্য ছিল, শুধু প্রকৃত যোগ্য প্রাপকদের কাছেই সুবিধা পৌঁছে দেওয়া।
যাচাইকরণের পর সুবিধাভোগীর সংখ্যা হ্রাস
সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, 'ইলেকট্রনিক নো ইউর কাস্টমার' (e-KYC) যাচাইকরণ এবং একাধিক সরকারি ডেটাবেসের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখার পর এই প্রকল্পের অধীনে সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় ২.৪ কোটি থেকে কমে ১.৬ কোটিতে নেমে এসেছে।
রাজ্য সরকারি কর্তারা জানিয়েছেন যে, বাতিলদের দেওয়া তথ্য, আয়কর দপ্তরের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার পর তাঁদের অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এই প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী, ২১ থেকে ৬৫ বছর বয়সী যেসব মহিলার পরিবারের বার্ষিক আয় ২.৫ লক্ষ টাকার কম, তারা প্রতি মাসে ১,৫০০ টাকা আর্থিক সহায়তা পাওয়ার অধিকারী।
যাচাইকরণ প্রক্রিয়ায় বেশ কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণিতে অযোগ্য সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রায় ২ লক্ষ মহিলাকে প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে কারণ তাঁরা ৬৫ বছরের উর্ধ্বসীমা পার করে ফেলেছিলেন। অন্যদিকে ৭৪,০০০ সুবিধাভোগীকে চিহ্নিত করা হয়েছে যাদের বয়স প্রকল্পের ন্যূনতম যোগ্যতার সীমা অর্থাৎ ২১ বছরের নীচে ছিল। আরও ৪.৪০ লক্ষ সুবিধাভোগীকে বাদ দেওয়া হয়েছে, কারণ তাঁরা সরকারি কর্মচারীদের পরিবারের সদস্য।
আঞ্চলিক পরিবহন দপ্তরের (আরটিও) নথিপত্রের সঙ্গেতথ্য মিলিয়ে দেখার ফলে আরও প্রায় ১.৮০ লক্ষ মহিলাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যাদের নামে যানবাহন নথিভুক্ত ছিল।
কর্মকর্তারা আরও জানান, এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৪,০০০ সরকারি কর্মচারীকেও চিহ্নিত করা হয়েছে। যারা অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও প্রকল্পের সুবিধা গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
একই সংখ্যক পুরুষ সুবিধাভোগীকেও চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা মহিলাদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি এই কল্যাণমূলক প্রকল্প থেকে সহায়তা গ্রহণ করেছিলেন। কর্তৃপক্ষ এই ঘটনাগুলিতেও অর্থ পুনরুদ্ধারের পদক্ষেপ করেছে। এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় আরও এমন সব ঘটনার কথা উঠে এসেছে, যেখানে দেখা গিয়েছে— উপকারভোগীরা ‘লাড়কি বহিন যোজনা’, ‘নমো শেতকারি সম্মান যোজনা’ এবং ‘সঞ্জয় গান্ধী নিরাধার যোজনা’-সহ একাধিক জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের আওতায় আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করছেন।
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যোগ্য উপকারভোগীরা যেকোনও একটি প্রকল্পের আওতায় সহায়তা পাওয়া অব্যাহত রাখবেন। তবে একাধিক প্রকল্প থেকে সুবিধা গ্রহণের (সুবিধার পুনরাবৃত্তি) বিষয়টি বন্ধ করে দেওয়া হবে।
সরকার প্রায় ২৫ লক্ষ উপকারভোগীর কেওয়াইসি বা গ্রাহক পরিচিতি সংক্রান্ত তথ্যেও বেশ কিছু অসঙ্গতি শনাক্ত করেছে। কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, এই রেকর্ডগুলো সংশোধন করা হয়েছে এবং যেখানে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে পুনরায় যাচাই-বাছাই বা ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া চালানো হতে পারে।
এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াটি ‘লাড়কি বহিন যোজনা’—যা ‘মহাযুতি’ সরকারের অন্যতম প্রধান জনকল্যাণমূলক প্রকল্প, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে।
রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে
বিরোধী দলগুলো যুক্তি দিয়েছে যে, উপকারভোগীর সংখ্যা কমে যাওয়াটা মূলত রাজ্য সরকারের ওপর বিদ্যমান আর্থিক চাপেরই প্রতিফলন। অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন যে, সরকারি অর্থের অপচয় রোধ এবং অযোগ্য প্রাপকদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার স্বার্থেই এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জরুরি ছিল।
সুপ্রিয়া সুলে যেভাবে উপকারভোগীদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেই পদ্ধতির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং এই প্রকল্পটির বিষয়ে আরও অধিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
এই প্রথম যে অনিয়মের বিষয়টি সামনে এল, তা নয়। গত বছর ‘তথ্য জানার অধিকার আইন’-এর আওতায় ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ যে তথ্য সংগ্রহ করেছিল, তাতে দেখা গিয়েছিল যে - অন্তত ১২,৪৩১ জন পুরুষ এবং অন্তত ১২,৯১৫ জন সরকারি কর্মচারী এই প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণ করেছেন।















