আজকাল ওয়েবডেস্ক: পশ্চিম এশিয়ায় ইজরায়েল ও ইরানের সংঘাত ক্রমশ তীব্র হওয়ায় ভারতের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়েও সতর্কতা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য জ্বালানি সঙ্কট এড়াতে ইতিমধ্যেই একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্র ও মহারাষ্ট্র সরকার। মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন জেলায় প্রশাসন ইতিমধ্যেই জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বিশেষ নজরদারি শুরু করেছে। বিশেষ করে ছত্রপতি সম্ভাজিনগর জেলায় তেল বিপণন সংস্থাগুলিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি মজুত রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই মজুত মূলত সরকারি ও জরুরি পরিষেবার গাড়ির জন্য সংরক্ষিত থাকবে। প্রশাসনের মতে, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় হঠাৎ অস্থিরতা দেখা দিলেও যাতে প্রশাসনিক কাজ ও জরুরি পরিষেবা ব্যাহত না হয়, সেই কারণেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। 

দেশের রান্নার গ্যাস সরবরাহ নিরাপদ রাখতে কেন্দ্র সরকার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। যেহেতু প্রোপেন ও বিউটেন গৃহস্থালির এলপিজির প্রধান উপাদান, ২০২৬ সালের ৫ মার্চ কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক একটি উচ্চপর্যায়ের নির্দেশ জারি করে জানায় সেই নির্দেশ অনুযায়ী অত্যাবশ্যক পণ্য আইন প্রয়োগ করে দেশের সমস্ত শোধনাগারকে প্রোপেন ও বিউটেন উৎপাদনে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য দেশের প্রায় ৩৩ কোটি পরিবারের রান্নার গ্যাস সরবরাহ সুরক্ষিত রাখা। ফলে গৃহস্থালি এলপিজির জন্য প্রোপেন ও বিউটেন সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। এর ফলে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে। ইতিমধ্যেই পুনের মতো শহরে গ্যাসচালিত কিছু দাহঘর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। 

সাধারণ গ্রাহকদের জন্য আপাতত কোনও বড় সঙ্কট নেই বলে আশ্বস্ত করেছে মহারাষ্ট্র সরকার। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডনবিশ রাজ্যবাসীকে অযথা আতঙ্কিত না হওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। বাজেট অধিবেশনের আগে তিনি বলেন, রাজ্যে পেট্রল বা ডিজেলের কোনও সাধারণ ঘাটতি নেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও চালু আছে। মুখ্যমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মোকাবিলায় কেন্দ্র সরকার তেল কূটনীতির কৌশলগত ব্যবহার করছে। সংঘাতপ্রবণ অঞ্চল ছাড়া অন্যান্য দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। বর্তমানে ভারতের কাছে প্রায় ৫০ দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগারগুলো উৎপাদন বজায় রাখতে রক্ষণাবেক্ষণের নির্ধারিত কাজও আপাতত স্থগিত রেখেছে। 

তবে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশের ওপর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ১১০ থেকে ১২০ ডলারের মধ্যে পৌঁছে গিয়েছে। অর্থাৎ, ভারতীয় অঙ্কে তা প্রায় ১০,০০০ থেকে ১১,০০০ টাকা। এর ফলে মহারাষ্ট্রের শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে রাসায়নিক ও উৎপাদন শিল্পে কাঁচামালের খরচ ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে শিল্পমহল জানিয়েছে। একই সঙ্গে পরিবহণ খাতও পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে, কারণ ডিজেলের দামের ওঠানামা পরিবহণ ব্যয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। 

মহারাষ্ট্র বিধানসভায় বাজেট আলোচনা শুরু হয়েছে। সেখানে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি স্বনির্ভরতার জন্য কৃষিক্ষেত্রে সৌরশক্তি প্রকল্পের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলাই সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।  

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যদি দীর্ঘ সময় বেশি থাকে, তবে রাজ্য সরকারকে ভর্তুকি বা আর্থিক স্বস্তির মতো অতিরিক্ত ব্যবস্থা বিবেচনা করতে হতে পারে। সরকারের লক্ষ্য, বিশ্ব সংঘাতের প্রভাব যেন রাজ্যের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় সঙ্কট তৈরি না করে।