আজকাল ওয়েবডেস্ক: মণিপুরে দীর্ঘদিনের অস্থিরতার মধ্যেই ফের নতুন করে হিংসার আগুন ছড়াল উখরুল জেলায়। টাংখুল নাগা সম্প্রদায়ের এক সদস্যের উপর হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রবিবার সন্ধ্যা থেকে জেলার লিতান গ্রাম ও সংলগ্ন এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সোমবার প্রশাসনকে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হয়।

প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার সন্ধ্যায় লিতান গ্রামে টাংখুল নাগা ও কুকি- এই দুই আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রথমে ব্যাপক পাথর ছোড়াছুড়ি শুরু হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলা প্রশাসন তৎপর হলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিংসা আরও ভয়াবহ আকার নেয়।

রবিবার মধ্যরাত নাগাদ লিতান সারেইখং এলাকায় যা মূলত একটি কুকি অধ্যুষিত গ্রাম, টাংখুল নাগা সম্প্রদায়ের একাধিক বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে সশস্ত্র দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় কাছাকাছি একটি এলাকায় কুকি সম্প্রদায়ের কয়েকটি বাড়িও জ্বালিয়ে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

এক জেলা আধিকারিক সংবাদ সংস্থাকে জানান, “ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ।”

এই ঘটনার মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে একাধিক আতঙ্কজনক ভিডিও। সেখানে দেখা যাচ্ছে, সশস্ত্র লোকজন বাড়ি ও গাড়িতে আগুন লাগাচ্ছে, কেউ কেউ আবার ছদ্মবেশী পোশাকে অত্যাধুনিক অস্ত্র থেকে গুলি ছুঁড়ছে। যদিও সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, এই ভিডিওগুলির সত্যতা তারা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

পরিস্থিতি সামাল দিতে লিতানমুখী সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায়, মহাদেব, লাম্বুই, শাংখাই-সহ একাধিক সংবেদনশীল এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। সন্দেহজনক চলাচল রুখতে কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর। এর আগেই রবিবার সন্ধ্যায় লিতান সারেইখং গ্রামে সংঘর্ষ চরমে উঠলে নিরাপত্তারক্ষীরা কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন।

উখরুলের জেলাশাসক আশিস দাস এক বিজ্ঞপ্তিতে জানান, টাংখুল নাগা ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার ফলে শান্তি ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেই কারণে রবিবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কার্যত কার্ফুর মতো নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সরকারি কর্মী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অবশ্য এই নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকবেন।

এই অশান্তির সূত্রপাত ঘটে শনিবার রাতে। লিতান গ্রামে টাংখুল নাগা সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তিকে ৭–৮ জনের একটি দল মারধর করে বলে অভিযোগ। প্রাথমিকভাবে বিষয়টি স্থানীয় রীতিনীতি ও প্রথাগত আলোচনার মাধ্যমে মেটানো হয়েছিল। লিতান সারেইখং গ্রামের প্রধান ও আক্রান্ত ব্যক্তির পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয় এবং রবিবার একটি বৈঠকে সেই সমাধান চূড়ান্ত করার কথা ছিল। কিন্তু সেই বৈঠক আর অনুষ্ঠিত হয়নি।

বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে, যখন পাশের সিকিবুং গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা লিতান সারেইখং গ্রামের প্রধানের বাড়িতে হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। সূত্রের খবর, ওই দলটি লিতান থানার কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় অন্তত সাত রাউন্ড গুলি চালায়। এতে গোটা এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

উল্লেখ্য, মণিপুরে টাংখুল নাগারা বৃহত্তম নাগা জনগোষ্ঠী, অন্যদিকে কুকিরাও রাজ্যের অন্যতম প্রধান আদিবাসী সম্প্রদায়। সাম্প্রতিক এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, মণিপুরে শান্তি কতটা কম। গত এক বছরে একের পর এক জাতিগত ও উপজাতিগত সংঘর্ষ রাজ্যটিকে কার্যত বারুদের স্তূপে পরিণত করেছে। প্রতিটি নতুন অশান্তির ঘটনায় সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ঘরছাড়া হচ্ছেন, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, আর প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনী প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই আগুন নেভানোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।