আজকাল ওয়েবডেস্ক: দিল্লির উচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক একটি রায় ভারতের স্বাধীন গণমাধ্যম এবং আইনি ব্যবস্থার পরিধির ওপর নতুন করে আলো ফেলেছে। দীর্ঘদিন ধরে আইনি টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাওয়া ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল 'নিউজক্লিক'-এর বিরুদ্ধে আনা অর্থ পাচার (মানি লন্ডারিং) এবং প্রতারণার মামলাটি খারিজ করে দিয়েছেন বিচারপতি নীনা বনসল কৃষ্ণ। আদালতের এই সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি ছিল একটি অত্যন্ত সরল ও অকাট্য আইনি যুক্তি— যেখানে মূল অপরাধেরই কোনও অস্তিত্ব নেই, সেখানে অর্থ পাচারের মামলা কিছুতেই টিকতে পারে না। প্রিভেনশন অব মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট (PMLA) বা অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনের ধারা অনুযায়ী, কোনও  অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত অর্থকে বৈধ করার চেষ্টাকেই পাচার বলা হয়। কিন্তু নিউজক্লিকের ক্ষেত্রে মূল যে অপরাধের অভিযোগ তোলা হয়েছিল, আইনি চুলচেরা বিশ্লেষণে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে।

গোটা বিতর্কটির সূত্রপাত হয়েছিল ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে নিউজক্লিকের মূল সংস্থায় আসা একটি বিদেশি বিনিয়োগকে কেন্দ্র করে। আমেরিকার বিনিয়োগকারী সংস্থা 'ওয়ার্ল্ডওয়াইড মিডিয়া হোল্ডিংস এলএলসি' থেকে প্রায় ৯.৫৯ কোটি টাকা পেয়েছিল নিউজক্লিক, যার বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে কিছু শেয়ার দেওয়া হয়। এই পুরো লেনদেনটি সম্পন্ন হয়েছিল ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে এবং রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়াকে (আরবিআই) সমস্ত নিয়ম মেনেই তা জানানো হয়েছিল। কিন্তু এর দুই বছরেরও বেশি সময় পর, ২০২০ সালের আগস্টে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের  এক কর্মকর্তার অভিযোগের ভিত্তিতে দিল্লি পুলিশের অর্থনৈতিক অপরাধ শাখা একটি এফআইআর দায়ের করে। অভিযোগ ছিল— প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের। পুলিশি তৎপরতার পরপরই এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) আসরে নামে এবং নিউজক্লিকের অফিস ও সাংবাদিকদের বাড়িতে দীর্ঘ তল্লাশি চালায়।

আদালত এই মামলার প্রতিটি অভিযোগ খতিয়ে দেখে স্পষ্ট জানিয়েছে যে, প্রসিকিউশনের দাবিগুলো বাস্তবের মাটিতে দাঁড়াতে পারছে না। প্রথমত, অভিযোগ ছিল যে নিউজক্লিক ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগের নির্ধারিত ঊর্ধ্বসীমা এড়াতে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে দেখিয়েছিল। কিন্তু আদালত মনে করিয়ে দিয়েছে, ২০১৮ সালে যখন এই টাকা এসেছিল, তখন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যমে ২৬ শতাংশ বিনিয়োগের এই নিয়মটি কার্যকরই ছিল না; নিয়মটি এসেছে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ফলে যা অস্তিত্বেই ছিল না, তা ফাঁকি দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তার চেয়েও বড় কথা, বিনিয়োগ নেওয়ার আগে নিউজক্লিক স্বয়ং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের  চিঠি লিখে নিয়মাবলী জানতে চেয়েছিল এবং মন্ত্রক  নিজেই জানিয়েছিল যে তখন পর্যন্ত অনলাইন মাধ্যমের জন্য কোনও  ঊর্ধ্বসীমা ছিল না।

শেয়ারের অতিরিক্ত মূল্যায়ন বা ওভারভ্যালুয়েশনের অভিযোগটিও আদালতে টেকেনি। নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশি ক্রেতার কাছে শেয়ার বিক্রি করার সময় একটি স্বাধীন মূল্যায়নকারী সংস্থার নির্ধারিত দামের নিচে বিক্রি করা যায় না। নিউজক্লিকের ক্ষেত্রে শেয়ারের সেই সর্বনিম্ন দাম নির্ধারিত হয়েছিল ৯,১৮৮ টাকা। সেখানে দরকষাকষির পর শেয়ারটি ১১,৫১০ টাকায় বিক্রি করা হয়, যা সম্পূর্ণ আইনি সীমার মধ্যে একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত মাত্র। এমনকি বিদেশি বিনিয়োগকারী সংস্থাটি ভুয়ো বা বন্ধ হয়ে গেছে বলে যে দাবি করা হয়েছিল, তাও ভুল প্রমাণিত হয়। কারণ ডেলাওয়ারের আইন অনুযায়ী নতুন করে নথিভুক্ত হয়ে সংস্থাটি বৈধভাবেই কাজ করছিল। অন্যদিকে, বিদেশি টাকায় সাংবাদিকদের বেতন দেওয়া বা অফিসের ভাড়া চোকানোকে টাকা নয়ছয় বা সিফনিং বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টাকে নাকচ করে আদালত বলেছে, একটি নিউজক্লিকের মতো সংবাদমাধ্যম চালাতে গেলে সাংবাদিকদের বেতন দেওয়া এবং অন্যান্য সাধারণ খরচ করা কোনও  অপরাধ হতে পারে না।

এই পুরো মামলায় সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি বেরিয়ে আসে তদন্তকারী সংস্থার পেশ করা দুটি পৃথক স্ট্যাটাস রিপোর্টের অসঙ্গতি থেকে। প্রথম রিপোর্টে রিজার্ভ ব্যাংকের সেই ছাড়পত্রের উল্লেখ ছিল, যেখানে বলা হয়েছিল যে এই লেনদেনে কোনো আর্থিক অনিয়ম বা নিয়ম লঙ্ঘন হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে জমা দেওয়া দ্বিতীয় রিপোর্টটি থেকে রহস্যজনকভাবে আরবিআই-এর সেই ক্লিনচিটের কথাটি বাদ দিয়ে নতুন কিছু অভিযোগ জুড়ে দেওয়া হয়। আদালত এই বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখেছে এবং স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, কোনও  নিয়ন্ত্রক সংস্থার দেওয়া ছাড়পত্রকে এভাবে ধামাচাপা দিয়ে আদালতকে বিভ্রান্ত করা যায় না। বিচারপতি এই তদন্ত প্রক্রিয়াকে কেবল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা 'মালা ফাইডি' বলেই ক্ষান্ত হননি, একে মুক্ত ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ওপর একটি স্বেচ্ছাচারী আক্রমণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

যদিও ইডি এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা ভাবছে এবং তাদের দাবি যে প্রতারণাটি কোনও  ব্যক্তির সাথে নয় বরং রাষ্ট্র বা ব্যাংকের সাথে করা হয়েছে, তবুও বাস্তব সত্য এটাই যে দেশের সর্বোচ্চ ব্যাংক এই লেনদেন খতিয়ে দেখে আগেই সবুজ সংকেত দিয়েছিল। উল্লেখ্য, এই মামলাটি কিন্তু নিউজক্লিকের প্রতিষ্ঠাতা প্রবীর পুরকায়স্থের বিরুদ্ধে চলা ইউএপিএ (UAPA) বা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলাটি নয়, সেটি সম্পূর্ণ আলাদা ট্র্যাকে চলছে। তবে এই অর্থ পাচারের মামলার রায়টি একটি বড় বার্তা দিয়ে গেল যে, যেকোনও  এজেন্সির তদন্ত শুরু করার আগে প্রথম এবং সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হওয়া উচিত— আদৌ কি কোনও  অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, নাকি স্রেফ ধারণার ওপর ভিত্তি করে ক্ষমতার আস্ফালন চলছে?