আজকাল ওয়েবডেস্ক: দিল্লির বুকে এক মর্মান্তিক ও শিউরে ওঠার মতো ঘটনা সামনে এসেছে, যা শুনে যে কারও মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠবে। যে মানুষটির বাড়িতে গত ১৫ বছর ধরে বিশ্বস্ততার সঙ্গে কাজ করছিলেন, সেই মনিবের হাতেই যে এমন নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হবে, তা হয়তো ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি ৪৫ বছরের পরিচারিকা মীনা। দক্ষিণ-পূর্ব দিল্লির অভিজাত মাউন্ট কৈলাশ এলাকায় এই নৃশংস খুনের ঘটনায় হতবাক গোটা রাজধানী।

পেশায় চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ, পঞ্চাশোর্ধ্ব ডঃ মণীশ গুপ্ত তাঁর বাড়ির ছাদে ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে বেধড়ক পেটানোর পর ছুরি দিয়ে কুপিয়ে খুন করেছেন দীর্ঘদিনের পরিচারিকা মীনাকে। প্রাথমিকভাবে শোনা যাচ্ছিল যে, 'কালো জাদু' বা 'নেতিবাচক শক্তি'-র সন্দেহে এই খুন। কিন্তু পুলিশ সেই জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে যে আসল কারণটি সামনে এনেছে, তা আমাদের পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের এক অন্ধকার দিককে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

দিল্লির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ-পূর্ব) হেমন্ত তিওয়ারি জানিয়েছেন, সম্প্রতি মীনাকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া নিয়ে ডঃ গুপ্তের সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর তুমুল অশান্তি হয়। ডঃ গুপ্তের স্ত্রী পেশায় একজন আয়ুর্বেদ চিকিৎসক। তিনি মীনাকে ছাড়িয়ে দেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করেন। কারণ, ডঃ গুপ্তের মা যখন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন, তখন এই মীনাই তাঁর নিজের হাতে অসীম স্নেহে সেবাযত্ন করেছিলেন। তদন্তকারীদের অনুমান, স্ত্রীর মুখে পরিচারিকার এই প্রশংসা শুনে ডঃ গুপ্তের মনে হয়েছিল পরিবারে তাঁর চেয়ে ওই পরিচারিকার গুরুত্ব বেশি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই হীনম্মন্যতা ও ক্ষোভ থেকেই হয়তো তিনি এই ভয়ংকর কাণ্ড ঘটিয়ে বসেন।

পুলিশ জানিয়েছে, গত প্রায় দশ বছর ধরে ডঃ গুপ্ত অবসাদ (ডিপ্রেশন) এবং অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডারে (ওসিডি) ভুগছিলেন এবং নিয়মিত ওষুধ খেতেন। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা ৩৬ মিনিট নাগাদ পাশের বাড়ির এক প্রতিবেশী পুলিশে খবর দেন যে, পাশের ছাদে এক মহিলাকে খুন করা হয়েছে এবং তিনি রক্তে ভাসছেন। পুলিশ তড়িঘড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছলে দেখে, মৃতদেহের পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন ডঃ গুপ্ত। পুলিশকে দেখেই তিনি বলে ওঠেন, "আমি আত্মসমর্পণ করছি।" পাশ থেকেই উদ্ধার হয় একটি ক্রিকেট ব্যাট এবং রক্তমাখা ছুরি। ঘটনার সময় ডঃ গুপ্তের স্ত্রী নিজের নার্সিংহোমে ছিলেন।

এই ঘটনায় মীনার পরিবার রীতিমতো দিশেহারা। মীনার ছেলে রবিন কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, "আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। মা যখন সকালে কাজে বেরোল, তখন একদম ঠিক ছিল। হঠাৎ একটা ফোন এল, আর বলল মা আর নেই! গত ১৫ বছর ধরে মা ওখানে কাজ করছে। আমি এখনও বিশ্বাসই করতে পারছি না।" মীনার ভাই শুভো ধর্গলও ক্ষোভে ও শোকে পাথর। তিনি বলেন, "আত্মীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে যখন ওখানে পৌঁছলাম, পুলিশ আমাকে দিদির মৃতদেহটা পর্যন্ত দেখতে দিল না।" মীনার পুরনো সহকর্মী পূজা বর্মার কথায়, "মীনা খুব শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিল, নিজের কাজ নিয়েই থাকত।"

যে প্রতিবেশী পুলিশে খবর দিয়েছিলেন, তিনি অবশ্য ডঃ গুপ্তের মানসিক অস্থিরতার দাবি মানতে নারাজ। তাঁর মতে, মণীশ গুপ্ত একজন অত্যন্ত ভালো প্রতিবেশী ছিলেন এবং তাঁর স্ত্রীও খুব ভদ্রমহিলা। তাঁদের আচরণে কখনও কোনও অস্বাভাবিকতা চোখে পড়েনি।

ডঃ মণীশ গুপ্তের শিক্ষাগত যোগ্যতা কিন্তু চমকে দেওয়ার মতোই। ১৯৯৯ সালে জয়পুরের নামকরা সওয়াই মান সিং (এসএমএস) মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করে তিনি দিল্লির জিবি পন্থ হাসপাতাল এবং খোদ এইমস (AIIMS)-এ রেসিডেন্ট ডাক্তার হিসেবে কাজ করেছেন। ২০০৫ সালে চর্মরোগে উচ্চতর ডিগ্রি লাভের পর ২০০৬ সাল থেকে তিনি এই মাউন্ট কৈলাশ এলাকায় প্রাইভেট প্র্যাকটিস শুরু করেন।

এত উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত একজন চিকিৎসক কীভাবে রাগের বশে এমন এক পাশবিক রূপ ধারণ করতে পারেন, তা ভেবেই শিউরে উঠছেন সকলে। আপাতত পুলিশ এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখছে এবং প্রতিবেশী ও পরিবারের লোকেদের বয়ান রেকর্ড করে এই মর্মান্তিক ঘটনার গভীরে পৌঁছনোর চেষ্টা করছে।