আজকাল ওয়েবডেস্ক: মহারাষ্ট্রে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা যেন এক অন্তহীন ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি বোম্বে হাইকোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এই ক্ষতকে আরও একবার প্রকাশ্যে এনে দিল। ২০১৪ সালে ওয়াডালা রেল পুলিশের হেফাজতে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় আটজন পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে খুনের মামলা বহাল রাখার যে নির্দেশ নিম্ন আদালত দিয়েছিল, উচ্চ আদালত তাকেই মান্যতা দিয়েছে। দিনের পর দিন অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়ে ওই যুবকের মৃত্যু হয়েছিল বলে অভিযোগ, যা আবারও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে রক্ষকই যখন ভক্ষক হয়, তখন বিচার পাওয়া কতটা কঠিন।

তবে এই ঘটনাটি কোনও বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়। ২০২৪ সালে মুম্বইয়ের একটি বিশেষ সিবিআই আদালত ২০০৯ সালের ঘাটকোপার কাস্টডিয়াল ডেথ মামলায় দুই পুলিশ অফিসারকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়। আবার ২০১৭ সালে সাঙ্গলিতে এক যুবকের মৃত্যুর পর প্রমাণ লোপাটের জন্য তাঁর দেহ পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল, যে ঘটনায় পাঁচজন পুলিশকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এমনকি খুব সম্প্রতি ২০২৫ সালে পারভনী জেলায় এক দলিত ছাত্রের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় সুপ্রিম কোর্ট কড়া অবস্থান নেওয়ায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার অধীনে খুনের মামলা রুজু করতে বাধ্য হয়েছে প্রশাসন। দশকের পর দশক ধরে চলা এই তালিকায় ২০০৩ সালের সেই হাই-প্রোফাইল মামলার কথাও উঠে আসে, যেখানে একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের মৃত্যুর ঘটনায় একাধিক প্রভাবশালী এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট অভিযুক্ত হয়েছিলেন। দু’দশক পেরিয়ে গেলেও সেই পরিবার আজও সুবিচারের আশায় দিন গুনছে।

&t=1s

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর তালিকায় মহারাষ্ট্রের নাম ধারাবাহিকভাবে শীর্ষে থাকছে। ১৯৯৪ থেকে ২০২২ সালের পরিসংখ্যান বলছে, এই রাজ্যে বছরে গড়ে ২১টি করে কাস্টডিয়াল ডেথ রেকর্ড করা হয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো এই অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া। ১৯৯৯ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ৪০৪টি মৃত্যুর ঘটনার মধ্যে মাত্র ৫৩টিতে এফআইআর দায়ের হয়েছিল এবং চার্জশিট জমা পড়েছিল মাত্র ৩৮টিতে। অর্থাৎ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযুক্তরা আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।

গত পাঁচ বছরের চিত্রটা আরও ভয়াবহ। মহারাষ্ট্রে এই সময়কালে ১০১ জন বন্দি প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু মহারাষ্ট্র নয়, জাতীয় স্তরেও চিত্রটা অস্বস্তিকর। ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের মধ্যে দেশজুড়ে ৮০৬টি এই ধরনের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এই তালিকায় মহারাষ্ট্রের ঠিক পরেই রয়েছে গুজরাট (৮৫), বিহার (৭৬), উত্তরপ্রদেশ (৫৬) এবং রাজস্থান (৫১)। ক্রমাগত বাড়তে থাকা এই মৃত্যুমিছিল পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ করার পদ্ধতি এবং মানবাধিকার রক্ষা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞ এবং মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, নিছক তদন্ত নয়, বরং পুলিশি ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার এবং কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে থানার চারটে দেওয়ালের ভেতরে এই নিঃশব্দ মৃত্যু বন্ধ করা সম্ভব হবে না।