আজকাল ওয়েবডেস্ক: হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ে প্রকৃতির বহু রহস্যই পরম যত্নে লুকানো থাকে। তেমনই এক অবিশ্বাস্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে চোখ কপালে উঠেছে গোটা উদ্ভিদবিজ্ঞান জগতের। দীর্ঘ ১৫৮ বছর ধরে ভারত থেকে প্রায় নিখোঁজ থাকা এক অতিক্ষুদ্র ও বিরল প্রজাতির নীল-বেগুনি ফুল 'সায়ানান্থাস হুকারি' (Cyananthus hookeri)-র পুনরাবিষ্কার ঘটেছে অরুণাচল প্রদেশের পাহাড়ি উপত্যকায়।

বোটানিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (BSI)-র বিজ্ঞানী সুধাংশু শেখর দাশের নেতৃত্বে শুভজিৎ লাহিড়ী ও মোনালিসা দাস অরুণাচল প্রদেশের তওয়াং জেলার ভারত-চীন সীমান্ত সংলগ্ন দুর্গম চুন উপত্যকায় এই অনুসন্ধান চালান। তওয়াংয়ের মাগো গ্রামের কাছাকাছি প্রায় ৩,৬০০ মিটার (১১,৮০০ ফুট) উঁচুতে পাহাড়ি পাথুরে এবং ঘাসযুক্ত খাড়া ঢালে নীলচে-বেগুনি রঙের ছোট ছোট কিছু ঘণ্টা আকৃতির ফুল ফুটতে দেখেন তারা। পরবর্তীতে হাওড়ার সেন্ট্রাল ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামে সংরক্ষিত ১৯ শতকের নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এটিই সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক ফুল। সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত গবেষণা পত্রিকা ‘Oryx’-এ তাঁদের এই ঐতিহাসিক আবিষ্কারের তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

ক্যাম্পানুলেসি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এই বামন আকৃতির ফুলটি ভারতে প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ উদ্ভিদবিদ স্যার জোসেফ ডাল্টন হুকার, ১৮৬৭ সালে সিকিমে। কিন্তু এর পর আর ভারতের কোথাও এই উদ্ভিদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। যদিও চীন, তিব্বত, নেপাল ও ভুটানে মাঝে মধ্যে এর উপস্থিতি দেখা গেছে। চরম প্রতিকূল পরিবেশ, বছরের অধিকাংশ সময় বরফের নিচে চাপা পড়ে থাকা এবং চুন উপত্যকার মতো যোগাযোগহীন পাহাড়ি অঞ্চলে সাধারণ মানুষের নাগাল না থাকায় দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এটি ভারতে সম্পূর্ণ অলক্ষ্যেই থেকে গিয়েছিল। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে মাত্র কয়েক সপ্তাহের জন্যই এই বিশেষ ফুল ফোটে। ফুলটির নলের ভেতর থাকা বিশেষ রোমশ অংশ ঠাণ্ডা বাতাস এবং বৃষ্টি থেকে পরাগরেণুকে রক্ষা করে।

পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকেও এই উদ্ভিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ আল্পাইন অঞ্চলে জন্মানো এই উদ্ভিদের শক্ত শিকড় পাহাড়ি এলাকার পাতলা মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখতে সাহায্য করে, যার ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত বা বরফ গলার কারণে হওয়া ক্ষয় রোধ হয়। পাশাপাশি গ্রীষ্মকালের শেষের দিকে হিমালয়ের বুনো মৌমাছি ও উচ্চভূমির পতঙ্গদের খাবারের প্রধান উৎস হয়ে ওঠে এই ফুলের মধু।

তবে এমন এক রোমাঞ্চকর আবিষ্কারের পরও বিজ্ঞানীরা শঙ্কামুক্ত হতে পারছেন না। পুরো এলাকা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ভারতে এই প্রজাতির মাত্র ৫০টিরও কম পূর্ণাঙ্গ গাছ বেঁচে রয়েছে, যা মাত্র ৩ থেকে ৭টি ছোট ছোট দলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। যেকোনো সময় আচমকা ভূমিধস, বিশ্ব উষ্ণায়ন কিংবা পাহাড়ে রাস্তা তৈরির মতো অপরিকল্পিত উন্নয়নের ধাক্কায় এই প্রজাতির অস্তিত্ব চিরতরে মুছে যেতে পারে। সেই আশঙ্কাতেই বিরল এবং বিপন্ন এই আল্পাইন ফুলটিকে দ্রুত জাতীয় স্তরে সংরক্ষণের আওতায় আনার জন্য কেন্দ্রের কাছে বিশেষ আর্জি জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।