আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিরোধী দলগুলোর তীব্র বাধা এবং প্রতিবাদের মধ্যেই আসাম বিধানসভায় পাস হয়ে গেল বিতর্কিত ইউনিফর্ম সিভিল কোড (UCC) বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল। আসামের বিজেপি সরকারের আনা এই নতুন আইনটি নিয়ে ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে তুমুল বিতর্ক ও তরজা শুরু হয়েছে। কাগজে-কলমে এই আইনের মূল লক্ষ্য বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করা হলেও, সমালোচকদের একাংশ একে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মেরুকরণের চেষ্টা হিসেবেই দেখছেন।

বিলটি পাস হওয়ার পর আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, এটি আসামের ইতিহাসের সবচেয়ে ধর্মনিরপেক্ষ, অভিন্ন এবং প্রগতিশীল একটি আইন, যা বিশেষ করে রাজ্যের নারী শক্তিকে বহুবিবাহের হাত থেকে রক্ষা করবে এবং তাঁদের অধিকার সুনিশ্চিত করবে। এই আইনের অধীনে বহুবিবাহকে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যেখানে দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত জেলের বিধান রয়েছে। একই সাথে বিবাহবিচ্ছেদ, পৈতৃক সম্পত্তি এবং খোরপোশের ক্ষেত্রেও মহিলাদের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে এই বিলে।

অন্যদিকে, বিরোধী দল কংগ্রেসের বিধায়ক ওয়াজেদ আলী চৌধুরী এবং জাকির হুসেন সিকদার এই বিলের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের মতে, এই আইন মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে এবং ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে সামাজিক ও ধর্মীয় উত্তেজনা তৈরি করবে। বিরোধীদের অভিযোগ, কোনও  রাজনৈতিক দল, সামাজিক গোষ্ঠী বা ধর্মীয় সংগঠনের সাথে পর্যাপ্ত আলোচনা না করেই তড়িঘড়ি করে এই আইন পাস করা হয়েছে। রাইজর দলের বিধায়ক অখিল গগৈ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এই বিলের মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ককে আমলাতন্ত্র এবং পুলিশের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে, যা সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করার পথ প্রশস্ত করবে।

নতুন এই আইনের অন্যতম বড় এবং বিতর্কিত দিক হলো 'লিভ-ইন রিলেশনশিপ' বা বিয়ে ছাড়া একসঙ্গে থাকার বিষয়টি। আসামে এবার থেকে যেকোনো লিভ-ইন সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরকারের কাছে নাম নথিভুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, কোনও  যুগল যদি তাঁদের লিভ-ইন সম্পর্কের রেজিস্ট্রেশন না করান, তবে তাঁদের ৩ মাসের জেল হতে পারে। এই সম্পর্কগুলোর তদারকির জন্য একজন সাব-রেজিস্ট্রার নিয়োগ করা হবে, যিনি সম্পর্কের তথ্য পাওয়ার পর স্থানীয় থানায় বিষয়টি জানাবেন। শাসকদলের বিধায়কদের দাবি, এই আইন লিভ-ইন সম্পর্ককে নিষিদ্ধ করছে না, শুধু নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের স্বার্থে এর একটি সরকারি হিসাব রাখছে।

এই বিলটি আসামের তফসিলি উপজাতি বা আদিবাসী (Scheduled Tribes) সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর প্রযোজ্য হবে না। আর এই বিষয়টি নিয়েই বিধানসভায় সুর চড়িয়েছে বিরোধী দলগুলো। কংগ্রেসের প্রশ্ন, এই আইন যদি সত্যিই নারীদের সুরক্ষার জন্য হয়, তবে আদিবাসী নারীদের কেন এই সুরক্ষার বাইরে রাখা হলো? এর জবাবে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়েছেন, আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর নিজস্ব অত্যন্ত শক্তিশালী সামাজিক ও প্রথাগত বিচারব্যবস্থা রয়েছে, যার মাধ্যমে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে নারীদের মর্যাদা রক্ষা করে আসছেন, তাই তাঁদের এই আইনের বাইরে রাখা হয়েছে।

বিজেপি এবং সহযোগী দল অসম গণ পরিষদ (AGP)-এর বিধায়কদের দাবি, বহুবিবাহের কারণে রাজ্যে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ এবং জনবিন্যাসের যে পরিবর্তন ঘটছিল, এই আইন তা রুখতে সাহায্য করবে। সব মিলিয়ে, আসামের এই নতুন দেওয়ানি বিধি আগামী দিনে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার।