আজকাল ওয়েবডেস্ক: "পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। রাওয়ালাকোট লাশে ভরে গিয়েছে"- সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার আকিল ভাইকে একটি ভাইরাল ভিডিওতে এমন কথা বলতে শোনা যায়। পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে (পিওকে) নির্বাচন বয়কটের দাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর পাকিস্তানের দমন-পীড়নের সময় এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছিল। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় পাকিস্তান তাদের সেই পুরনো কৌশলের আশ্রয় নেয়। যা হল- বিক্ষোভকারীদের ভারতের সমতুল্য বা 'শত্রু' হিসেবে চিহ্নিত করা। অথচ পিওকে-তে দিল্লির নয়, বরং ইসলামাবাদেরই চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এর মাধ্যমেই পাকিস্তানের ভণ্ডামি পুরোপুরি উন্মোচিত হয়ে পড়েছে।

সোমবার পিওকে-তে, নির্বাচনের প্রথম পর্যায়ে বিশেষ করে রাওয়ালাকোট ও মীরপুরে নতুন করে হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। গত এক মাস ধরে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী নিষিদ্ধ সংগঠন 'জম্মু-কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি'-র (জেকেজেএএসি) অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরা যখন মুজাফফরাবাদের দিকে মিছিল করে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখন নিরাপত্তা বাহিনী তাদের ওপর গুলি চালিয়েছিল। তাতেই প্রায় ৪০ জন নিহত হন।

পিওকে নিয়ে পাকিস্তানের ভণ্ডামি ফাঁস
বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনাকে নির্লজ্জভাবে সমর্থন জানিয়ে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ। তাঁর কথায়, পাকিস্তান পিওকে-র আন্দোলনকারীদের ভারতের মতোই 'শত্রু' বলে মনে করে। স্থানীয় একটি সংবাদমাধ্যমকে আসিফ বলেন, "ভারতকে যে চোখে দেখি, আমি পিওকে-র জেকেজেএএসি আন্দোলনকারীদেরও এতকই পর্যায়ের  শত্রু বলে মনে করি।"

আসিফের এই মন্তব্য পিওকে নিয়ে পাকিস্তানের কয়েক দশকের দ্বিচারিতা স্পষ্ট করে দিয়েছে। পাক অধিকৃত কাশ্মীরকে ইসলামাবাদ নিজেদের বলে দাবি করে এবং এই অঞ্চলের ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

যদিও পিওকে-র নিজস্ব প্রধানমন্ত্রী ও প্রশাসন রয়েছে, তবে তারা কেবল দৈনন্দিন শাসনকাজ পরিচালনা করে। পিওকে-র প্রতিরক্ষা ও বিদেশনীতির ওপর পাকিস্তানের সরকারের (বা সুনির্দিষ্টভাবে বললে, তাদের সেনাবাহিনীর) কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।সপিওকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে একটি মুচলেকা দিতে হয়। সেই মুচলেকায় নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিদের পিওকে-র পাকিস্তানের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি স্বীকার করে নেওয়া হয়।

বছরের পর বছর ধরে পাকিস্তান নিজেকে কাশ্মীরিদের অধিকারের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। তারা নিয়ন্ত্রণরেখার (এলওসি) উভয় পাশের মানুষের হয়ে কথা বলার দাবি করে এবং রাষ্ট্রসংঘে কাশ্মীর ইস্যুটি জোরালোভাবে উত্থাপন করে এসেছে। কিন্তু একই সঙ্গে, পাকিস্তান তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাতেই কাশ্মীরিদের হত্যার পথ বেছে নিয়েছে। পিওকে-এর স্থানীয় বিক্ষোভকারীদের ভারতের সঙ্গে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে আসিফ আসলে এটাই বোঝাতে চেয়েছেন যে, ইসলামাবাদ পিওকে-র বাসিন্দাদের নিজেদের লোক বলে মনে করে না।

তাছাড়া, পাকিস্তান বরাবরই এমন অপপ্রচার চালিয়ে এসেছে যে- পিওকে-র তুলনায় জম্মু ও কাশ্মীরে ভারত মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। সেই দুর্বল বয়ানটি এখন ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে।

পিওকে-তে হিংসায় নিয়ে ভারত কী বলল?
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই মন্তব্যের অর্থ ভারতের কাছে কী? দিল্লির মতে, আসিফের এই মন্তব্য তাদের দীর্ঘদিনের অবস্থানকেই আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। দিল্লি বরাবরই বলে এসেছে যে, সমগ্র জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ- যার মধ্যে পাকিস্তানের অবৈধ ও জোর করে দখলে থাকা অঞ্চলগুলোও অন্তর্ভুক্ত,তা ভারতের অবিচ্ছেদ্য ও অবিভাজ্য অংশ। পাশাপাশি, পিওকে-তে পাকিস্তানের আয়োজিত নির্বাচন এবং প্রশাসনিক পরিবর্তনের বিরুদ্ধেও ভারত বারবার আপত্তি জানিয়ে এসেছে।

মঙ্গলবার ভারতের বিদেশমন্ত্রক অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, "বর্তমানে যে লোক দেখান নির্বাচনী প্রক্রিয়া চলছে, তা আসলে পাকিস্তানের একটি প্রচেষ্টা মাত্র। এর মাধ্যমে ইসলামাবাদ পিওকে-তে নিজেদের অবৈধ দখলদারিত্বকে আড়াল করতে এবং ওই অঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর ঘটনাগুলোকে গোপন করতে চাইছে।"

মূলত, একটিমাত্র বক্তব্যের মাধ্যমেই পাকিস্তানের নিজস্ব মন্ত্রী দশকের পর দশক ধরে চলে আসা রাষ্ট্রীয় প্রচারককে ধূলিসাৎ করে দিয়েছেন। এর আগেও আসিফ দাবি করেছিলেন যে, পিওকে-র রাওয়ালাকোট ও মীরপুরের বাসিন্দারা "আসল কাশ্মীরি নন"। তাছাড়া, এটাও মনে রাখা জরুরি যে, পিওকে-তে গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে যে বিক্ষোভ চলছে, তার সূত্রপাত হয়েছে স্থানীয় ক্ষোভ থেকে, ভারতের প্ররোচনায় নয়। নির্বাচনের আগে বিদ্যুৎ-এর মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং মুদ্রাস্ফীতির মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে সেখানে হিংসামুখর বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

এর পাশাপাশি, বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও নাগরিক সংগঠনের যৌথ মঞ্চ 'জেএএসি'- পাকিস্তানজুড়ে শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিলের দাবি জানিয়েছে। তাদের যুক্তি হল, লাহোর বা রাওয়ালপিন্ডির ভোটারদের হাতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পিওকে বিধানসভার গঠন নির্ধারণ করা উচিত নয়।

এই বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে জুন মাস থেকেই সেখানে দফায় দফায় হিংসা চলছে। বিক্ষোভকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে। জেএএসি-র দাবি, ৫ই জুন বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে পিওকে-তে ৮০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

পাকিস্তান ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে এবং খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে আটকে এই বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু তাতেও বিক্ষোভকারীদের দমানো যায়নি। পুলিশের বিরুদ্ধে অত্যধিক বলপ্রয়োগের অভিযোগ সত্ত্বেও "পিওকে পাকিস্তানের অংশ নয়" এমন স্লোগান সেখানে জারি রয়েছে।

'লাশে পরিপূর্ণ'
সোমবার পরিস্থিতি এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের রূপ নেয়, যখন পিওকে নির্বাচন বয়কটের ডাক দেওয়া বিক্ষোভকারীদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনী গুলি চালায়। তবে সরকারের অভিযোগ, জেএএসি-র বিক্ষোভকারীরাই নিরাপত্তা কর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল। এক্স-এ ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার চিত্র ধরা পরড়েছে। এক্স-এ প্রকাশিত ওই ভিডিওগুলোতে রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মৃতদেহ দেখা গিয়েছে।

একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে স্থানীয়দের আহত ব্যক্তিদের কাঁধে করে নিয়ে যেতে হয়েছিল। ৪ লাখেরও বেশি ফলোয়ার-বিশিষ্ট ইনফ্লুয়েন্সার আকিল ভাই সোমবারের সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, "আমি কোনওমতে প্রাণ নিয়ে বেঁচে ফিরেছি... সেখানে অসংখ্য মৃতদেহ ও অগণিত আহত মানুষ পড়ে আছে। মৃতদেহ বহন করতে করতে আমাদের কাঁধ অবসন্ন হয়ে পড়েছে... রাস্তায় কাশ্মিরিদের রক্ত ​​লেগে আছে," 

এমন পরিস্থিতিতে, পিওকে-এর বিক্ষোভকারীদের ভারতের সঙ্গে তুলনা করে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর করা বিস্ফোরক মন্তব্যটি ইসলামাবাদের ভণ্ডামিকেই প্রকাশ করল। পিওকে পাকিস্তানের অবৈধ দখলে রয়েছে। বর্তমান বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির জন্য তারাই দায়ী। অথচ এর জন্য পাকিস্তানের শাসকপক্ষ ভারতকে দোষারোপ করছে। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের আসল রূপ স্পষ্টভাবে বেরিয়ে এসেছে।