আবু হায়াত বিশ্বাস, দিল্লি: আবগারি দুর্নীতি মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ে দলীয় প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালের অব্যাহতির পর আম আদমি পার্টি (আপ) শিবিরে উচ্ছ্বাসের ঢেউ। রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়ে দলীয় নেতৃত্বের দাবি—‘সত্যের জয় হয়েছে’। দীর্ঘ তদন্ত, গ্রেপ্তারি, জেল ও তল্লাশির পর আদালতের এই সিদ্ধান্ত শুধু আইনি স্বস্তিই দেয়নি, রাজনৈতিকভাবে নতুন অক্সিজেন জুগিয়েছে আপ-কে।
দিল্লি ও পাঞ্জাব—দুই রাজ্যেই কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নতুন উদ্যম স্পষ্ট। গতকালের রায়ের পর উচ্ছ্বাসে ভেসেছে আপ নেতা-কর্মী সমর্থকেরা।
দিল্লিতে ক্ষমতা হারানোর পর আপ অনেকটাই রক্ষণাত্মক অবস্থানে ছিল। বিজেপির ধারাবাহিক আক্রমণ ও ‘দুর্নীতি’ ইস্যুতে চাপে পড়েছিল দল। কিন্তু কেজরিওয়াল ও সিনিয়র নেতা মণীশ শিশোদিয়াদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থেকে অব্যাহতির পর নেতৃত্ব ফের আক্রমণাত্মক। আপের বক্তব্য, ‘বিজেপি আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতায় আঘাত হানতে চেয়েছিল। আদালতের রায়ে সেই অভিযোগ ভোঁতা হয়ে গেল।’
দিল্লি আপ সভাপতি সৌরভ ভরদ্বাজ ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন, ১ মার্চ দিল্লির যন্তরমন্তরে মেগা র্যালির মাধ্যমে নতুন কর্মসূচির সূচনা হবে। দলীয় সূত্রের দাবি, ওই র্যালিতে বিপুল জনসমাগম হবে। আপ সরকারের তৈরি করা মহল্লা ক্লিনিক থেকে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর অপসারিত হয়েছেন চিকিৎসক-নার্সরা। তারা এবং চাকরি হারানো প্রায় ১০ হাজার বাস মার্শাল ইউনিফর্ম পরে রবিবারের যন্তরমন্তরের সভায় যোগ দেবেন বলে খবর।
কেজরিওয়াল ও শিশোদিয়া তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখবেন। আপের মতে, এই সমাবেশ শুধু কেজরিওয়ালদের ক্লিনচিট-এর ‘উদযাপন’ নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তাও—‘এজেন্সিকে দিয়ে ভয় দেখিয়ে লাভ নেই, সত্যের জন্য লড়াই চালিয়ে যাবে আপ।’
দলীয় নেতৃত্বের ইঙ্গিত, দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে এখনও সময় থাকায় কেজরিওয়ালকে জাতীয় রাজনীতিতে আরও সক্রিয় দেখা যেতে পারে। বিরোধী জোট-রাজনীতির সম্ভাবনা, বিজেপি-বিরোধী আঞ্চলিক শক্তিগুলির সঙ্গে সমন্বয়—এসব নিয়েও ভাবনা শুরু হয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিক রোডম্যাপ এখনও ঘোষণা হয়নি, কেজরিওয়াল শিগগিরই কোর টিমের সঙ্গে বৈঠকে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা চূড়ান্ত করবেন বলে জানা গেছে।
বর্তমান দিল্লি মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তারর প্রসঙ্গ টেনে সৌরভ ভরদ্বাজ বলেন, ‘দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর পদ বড় দায়িত্ব। আমাদের তোলা জনস্বার্থের ইস্যুগুলি সামাল দেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।’ আপের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করে অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিকে চাপে রাখা হয়েছে। আদালতের রায়ে সেই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে বলেই দাবি তাদের।
আপের শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, এই রায় কর্মী-সমর্থকদের মনোবল বহুগুণ বাড়াবে। ভরদ্বাজের বক্তব্য, কেজরিওয়াল একজন প্রাক্তন আইআরএস অফিসার ও আইআইটি-শিক্ষিত নেতা; তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘ তদন্তেও দুর্নীতির প্রমাণ মেলেনি। ‘তিনি জেল থেকে বেরিয়েছেন মানুষের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প নিয়ে’—দাবি আপ শিবিরের।
ইতিমধ্যেই ওয়ার্ড ও মণ্ডল স্তরে সভা-সমাবেশ শুরু হয়েছে। প্রতিদিন ৫০-৬০টি ছোট সভা হচ্ছে, যা এক মাস চলবে। শহর-সংক্রান্ত সমস্যা—জল, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য পরিষেবা—এসবের পাশাপাশি আদালতের রায়ের বার্তাও ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হবে। কংগ্রেস ও বিজেপি ছাড়া প্রায় সব বিরোধী দলই আপ এর পাশে দাড়িয়েছে।
শনিবার কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, এই রায় শুধু বিজেপির জন্য নয়, কংগ্রেসের জন্যও ধাক্কা। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কংগ্রেস গেরুয়া শিবিরকে পরোক্ষে সহায়তা করেছে। কেন্দ্রীয় সংস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরাও বলছেন, আদালতের রায় আপ-কে নতুন লড়াইয়ের ময়দানে নামার সুযোগ করে দিয়েছে। বিরোধীদের মতে, আইনি লড়াই শেষ হয়নি; তবে আপ শিবিরের বিশ্বাস—এই মুহূর্ত তাদের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সূচনা। ১ মার্চের যন্তর মন্তর সমাবেশে সেই শক্তি-প্রদর্শন কতটা সফল হয়, এখন সেটাই দেখার।
















