গোপাল সাহা: কেন্দ্রীয় বাজেট ঘোষণা হওয়ার পাশাপাশি ভারতের ফার্মাসিউটিক্যাল ও বায়োফার্মা শিল্পকে বিশ্বমানের উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ঘোষণা করলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী শ্রীমতী নির্মলা সীতারামন। সংসদে পেশিত কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬–২৭-এ তিনি ঘোষণা করেন ১০,০০০ কোটি টাকার ‘বায়োফার্মা শক্তি’ (Biopharma SHAKTI) প্রকল্পের, যার লক্ষ্য ভারতকে বিশ্বমানের বায়োম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে গড়ে তোলা।
অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন জানান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকার ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে এগোচ্ছে। এই লক্ষ্যেই ফার্মাসিউটিক্যালস-সহ মোট ৭টি কৌশলগত ও ভবিষ্যৎমুখী খাতে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
'বায়োফার্মা শক্তি' প্রকল্পে কতটা উপকৃত হবে দেশের চিকিৎসা বিভাগ?- এক নজরে :
সাশ্রয়ী বায়োলজিক ওষুধে জোর, কমবে আমদানি নির্ভরতা: কেন্দ্রের বাজেট ভাষণে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, সাশ্রয়ী মূল্যে বায়োলজিক ও বায়োসিমিলার ওষুধ মানুষের দীর্ঘায়ু ও উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই লক্ষ্যেই আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চালু হচ্ছে ‘বায়োফার্মা শক্তি’।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশে উন্নত বায়োম্যানুফ্যাকচারিং পরিকাঠামো গড়ে উঠবে, উদ্ভাবনী গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়বে এবং উচ্চমূল্যের পরবর্তী প্রজন্মের থেরাপিতে ভারতের সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। ফলে বিদেশি ওষুধের উপর নির্ভরতা কমে দেশের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা আরও মজবুত হবে বলে মনে করছে কেন্দ্র।
ভারতকে ক্লিনিক্যাল গবেষণার জন্য একটি পছন্দের গন্তব্য হিসেবে আরও সুদৃঢ় করতে, বায়োফার্মা শক্তি প্রকল্পের অধীনে দেশজুড়ে ১,০০০-এর বেশি স্বীকৃত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সাইট গড়ে তোলার ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী।
এই বৃহৎ পরিসরের সম্প্রসারণের ফলে—
ভারতের ক্লিনিক্যাল গবেষণার গুণমান ও বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে
নতুন ওষুধ উন্নয়নের সময়সীমা কমবে
ভারতীয় রোগীরা অত্যাধুনিক চিকিৎসার আরও সহজলভ্য সুযোগ পাবেন
গবেষক, চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে
CDSCO হবে আরও শক্তিশালী :
আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে ও দ্রুত ওষুধ অনুমোদনের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ওষুধ মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (CDSCO)-কে আরও শক্তিশালী করার কথাও ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী। এর জন্য গঠিত হবে বিশ্বমানের বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা ক্যাডার ও নিয়োগ করা হবে দক্ষ বিশেষজ্ঞদের। যাতে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়।
নতুন NIPER, গবেষণায় দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার উদ্যোগ :
ফার্মাসিউটিক্যাল শিক্ষা ও গবেষণায় জোর দিতে বাজেটে ঘোষণা করা হয়েছে তিনটি নতুন NIPER (ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ফার্মাসিউটিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ) প্রতিষ্ঠার। পাশাপাশি, বর্তমানে থাকা ৭টি NIPER-এর আধুনিকীকরণ করা হবে।
এই পদক্ষেপের ফলে উচ্চমানের শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হবে, শিল্প ও শিক্ষাক্ষেত্রের মধ্যে সহযোগিতা বাড়বে এবং ভারতীয় ফার্মা ও বায়োফার্মা শিল্প বিশ্ববাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে। সব মিলিয়ে, কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬–২৭ ভারতের ফার্মাসিউটিক্যাল ও বায়োফার্মা খাতে এক নতুন যুগের সূচনা করল বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা একাংশ।
যদিও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এবং দেশের অন্যান্য বিরোধীরা এই বাজেটকে সম্পূর্ণ দেশবিরোধী ও দেশের মানুষকে বঞ্চিত করার বাজেট বলেই দাবি করেছেন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন এই বাজেট নিয়ে একাধিক কটাক্ষ করেছেন। দেশবিরোধী ও বাংলা বঞ্চিত বাজেট বলেই দাবি করেছেন। পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যন্ত এই বাজেটকে কড়া ভাষায় নিন্দা জানিয়েছেন। অন্যদিকে দেশের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস পর্যন্ত এই বাজেটকে একেবারেই অমানবিক এবং সাধারণ মানুষ বিরোধী বাজেট বলেই দাগিয়ে দিয়েছেন। মূলত স্বাস্থ্যকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত করে এই বাজেট তৈরি হয়েছে বলেই দাবি রাজ্য তথা দেশের সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলি।
বলাবাহুল্য কেন্দ্র সরকারের এই বাজেট জনসাধারণের কতটা হিতকর এবং স্বাস্থ্য সচেতন তা নিয়ে যথেষ্টই প্রশ্ন রয়েছে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের। কারণ এই বাজেটে যেমন জীবনদায়ী ওষুধ আমদানির ক্ষেত্রে মূল্য কমেছে, সার্বিকভাবে দাম ও গুণগত মানের জন্য কোন উল্লেখ নেই। পাশাপাশি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির পরিকাঠামো ও উন্নয়নের ক্ষেত্রেও কোনো রকম কোনো অর্থ বরাদ্দের কথা বলেনি কেন্দ্র সরকার। সে সবকিছুই রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
যদিও কেন্দ্রের দাবি, 'বায়োফার্মা শক্তি' প্রকল্পে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কারণে গুরুত্বপূর্ণ জীবন দায়ী ওষুধগুলি আমদানির উপরে ভরসা করতে হবে না। তৈরি হবে আমাদের দেশেই অধিকাংশ ওষুধগুলি অনেক কম সময়ের মধ্যে ও অনেক কম খরচে।
কেন্দ্রীয় বাজেটে বায়োফার্মা শক্তি প্রকল্প ও অর্থ বরাদ্দ নিয়ে ইনস্টিটিউট অফ চাইল্ড হেলথ (ICH) এর প্রিন্সিপাল চিকিৎসক জয়দেব রায় আমাদের সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বলেন, "আমি এই প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ নিয়ে কেন্দ্রকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু সেটা যেন কাজে বাস্তবায়িত হয়। শুধু খাতায়-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। কারণ আমরা পূর্বেও দেখেছি কেন্দ্রের HPV ভ্যাকসিন টিকাকরণের ক্ষেত্রে ঘোষণা করা হয়েছিল কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি ঠিকমত। তাই সেরকম যেন না হয় সেটাই আশা করব।"

চিকিৎসক এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে আরও বলেন, "গ্রামীণ স্বাস্থ্য কেন্দ্রের স্বচ্ছলতা এবং সকল হাসপাতালগুলির পরিকাঠামোগত ভাবে শক্ত করলে আরও অনেক বেশি ভালো হতো। তবে এই প্রকল্পকেও আমি অবশ্যই সাধুবাদ জানাই। একই সঙ্গে বাজেটে নেওয়া বিষয়গুলি যেন ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়। তাহলেও চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিরাট উন্নতি হবে। আমার মূলত তিনটে বলার বিষয় ১) বাস্তবায়িত রূপ, কাগজে-কলমে যেন না থাকে, ২) যে সমস্ত হাবগুলি তৈরি হবে তার কোয়ালিটি অর্থাৎ গুণগতমান যেন ঠিক থাকে। প্রতিমুহূর্তে যে পরিমাণ ভেজাল ওষুধ দেখা যাচ্ছে সেটা যেন না হয়। ভেজাল বা জাল হওয়া বন্ধ হয়। ৩) মানুষ যেন ঠিকমতো এর সুফল পায়। এই তিনটে দিক নজর রাখলেই বাজেটে নেওয়া এই পরিকল্পনা অনেক বেশি মানুষের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিরাট সুফল দেবে।"
এই বিষয়ে আমাদের সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ তথা বরিষ্ঠ আইনজীবী কল্যাণ ব্যানার্জি বলেন, "ললিপপের মত ইমপোর্ট মেডিসিনের কিছু দাম কমিয়েছে অর্থাৎ ট্যাক্স কমিয়েছে। বাকি স্বাস্থ্য খাতে আর সেই অর্থে বাজেট নেই। বাকি সবটাই ললিপপের মত। আবারো এই বাজেট প্রমাণ করলো কেন্দ্র সরকার গরিবদের পাশে নেই। পাশাপাশি কেন্দ্রের এই বাজেট প্রমাণ করে পশ্চিমবঙ্গকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত করছে। শিক্ষা ক্ষেত্রেও বাজেটে তেমন কোন অর্থ বরাদ্দ নেই। যা হয়েছে সেটা খুব নগণ্য। সামান্য কিছু জীবনদায়ী ওষুধে দাম কমলেও সিংহভাগ ওষুধ যা সাধারণ মধ্যবিত্ত বা গরিবরা চিকিৎসার প্রয়োজনে কিনতে গেলে প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে। সেইদিকে কেন্দ্রের কোনও নজরই নেই। অমানবিক সরকার।"
