পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল পরবর্তী রাজনৈতিক আবহে রাজ্যে যখন এক অস্থির সময় চলছে, ঠিক তখনই তৃণমূল কংগ্রেসের তিন মহিলা সাংসদকে নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মার্কণ্ডেয় কাটজুর একটি বিতর্কিত টুইট নতুন করে রাজনৈতিক মহলে ঝড় তুলেছে। শেক্সপিয়রের ‘ম্যাকবেথ’ নাটকের তিন ডাইনির সঙ্গে মহুয়া মৈত্র, সায়নী ঘোষ এবং সাগরিকা ঘোষের তুলনা টেনে কাটজু যে মন্তব্য করেছেন, তার পাল্টা জবাব দিতে ছাড়েননি কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্রও। এই বাদানুবাদ ঘিরেই এখন সরগরম সোশ্যাল মিডিয়া, যেখানে পুরনো ‘ক্যাশ ফর কোয়ারি’ বা টাকার বিনিময়ে প্রশ্নের অভিযোগ ফের একবার প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
2
5
বিচারপতি কাটজু তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে তৃণমূলের এই তিন পরিচিত মুখকে বিদ্রূপ করে লেখেন যে, তাঁরা সম্ভবত শীঘ্রই ঘাসফুল শিবিরের সবুজ-কমলা রঙ ছেড়ে বিজেপির গেরুয়া শিবিরে নাম লেখাবেন। এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। কয়েক দিন আগে সরাসরি মমতা ব্যানার্জিকে লক্ষ্য করে তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, এবার দিদির উচিত গেরুয়া বসন পরে হিমালয়ের গুহায় গিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করা, আর তাঁর ‘চামচি’ বা এই তথাকথিত ডাইনিরা সেখানে তাঁর সেবা করবে। কাটজুর এই মন্তব্যকে নেটিজেনদের বড় একটি অংশ ঘোরতর নারীবিদ্বেষী হিসেবে দেগে দিয়েছেন। বিশেষ করে মহুয়া, সায়নী এবং সাগরিকা—যাঁরা প্রত্যেকেই বিজেপির কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত, তাঁদের এমন কুরুচিকর আক্রমণ করায় ক্ষোভ ছড়িয়েছে রাজনৈতিক মহলে।
3
5
অবশ্য বিচারপতি কাটজুর বিতর্কিত মন্তব্যের ইতিহাস নতুন নয়। ২০২৫ সালেও মহিলা আইনজীবীদের নিয়ে এক আপত্তিকর মন্তব্যের জেরে তাঁকে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল। এবার মহুয়া মৈত্র সরাসরি তাঁর জবাব দিয়ে লেখেন, "স্যার, অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে আপনাকে সংশোধন করে দিই। আপনার মতো যাঁদের অবসরের পর সরকারি পদ পাওয়ার আশায় গোপনে সঙ্ঘী সাজতে হয়, আমি তাঁদের দলে পড়ি না। আমি নিজের যৌবন এবং কেরিয়ার বিসর্জন দিয়েছি কারণ আমি আমার আদর্শে বিশ্বাস করি। দয়া করে এই সংবেদনশীল সময়ে ভিত্তিহীন দাবি করবেন না।"
4
5
মহুয়ার এই কড়া বার্তার পর কাটজু পাল্টাপাল্টি হিসেবে পুরনো সেই ‘ক্যাশ ফর কোয়ারি’ বিতর্কের প্রসঙ্গটি টেনে আনেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে যে অভিযোগ সংসদকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন তিনি। সেই সময় দুবাইয়ের ব্যবসায়ী দর্শন হিরানন্দানি হলফনামা দিয়ে স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি মহুয়ার লগ-ইন আইডি ব্যবহার করে প্রশ্ন আপলোড করতেন। যদিও মহুয়া শুরু থেকেই দাবি করে এসেছেন যে, প্রশ্নগুলো তাঁর নিজেরই ছিল এবং তিনি কোনও অনৈতিক কাজ করেননি। দর্শনের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া স্কার্ফ বা কসমেটিকসকে তিনি স্রেফ বন্ধুত্বের নিদর্শন বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন। লোকসভার এথিক্স কমিটির সুপারিশে মহুয়াকে পদচ্যুত করা হলেও ২০২৪-এর নির্বাচনে বিপুল ভোটে জিতে তিনি ফের সংসদে ফিরেছেন।
5
5
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তৃণমূলের পরাজয় বা বিপর্যয়ের পর যখন বিরোধী শিবির নানাভাবে আক্রমণ শানাচ্ছে, তখন কাটজুর এই মন্তব্য মহুয়া মৈত্র বনাম বিচারপতির এক ব্যক্তিগত ও আদর্শিক লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। একদিকে সিবিআই মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, তখন কাটজুর মতো ব্যক্তিত্বের এমন উস্কানিমূলক পোস্ট আগুনে ঘি ঢালার কাজ করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদীয় রাজনীতিতে মহুয়ার প্রত্যাবর্তন যেমন তাঁর লড়াইয়ের প্রমাণ দিয়েছে, তেমনই কাটজুর মতো ব্যক্তিদের ধারাবাহিক ‘অপ্রাসঙ্গিক’ ও ‘বিদ্বেষমূলক’ মন্তব্য ভারতীয় বিচারব্যবস্থার প্রবীণ মুখদের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। সব মিলিয়ে, রাজ্য রাজনীতির এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে ‘ম্যাকবেথের ডাইনি’ উপমা আর ‘ক্যাশ ফর কোয়ারি’র পুনরাবৃত্তি এখন টক অফ দ্য টাউন।