ডিজিটাল দুনিয়া আর স্মার্টফোনের যুগে যেখানে বই পড়ার অভ্যাস ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে, সেখানে ভারতের এক প্রত্যন্ত গ্রামে যেন গড়ে উঠেছে রূপকথার মতো ঘটনা। কোনও কর্পোরেট বা সরকারি অনুদান ছাড়াই, একেবারে নিজের জেদ ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে লাইব্রেরি তৈরি করেছেন ৭৫ বছর বয়সি এক বৃদ্ধ। নাম তাঁর অঙ্কে গৌড়া।
2
10
একসময় বাসের টিকিট পরীক্ষা করতেন যিনি, আজ তিনিই ভারতের ২০ লাখ বইয়ের লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা। সমাজ ও শিক্ষার প্রতি তাঁর এই নিঃস্বার্থ অবদানকে সম্মান জানিয়ে ভারত সরকার তাঁকে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মান ‘পদ্মশ্রী’-তে ভূষিত করেছে।
3
10
কর্ণাটকের মাণ্ড্য জেলার এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম অঙ্কে গৌড়ার। ছোটবেলায় পড়ার খুব ইচ্ছে থাকলেও বই কেনার মতো সামর্থ্য ছিল না। এই অভাবটাই তাঁর মনে বইয়ের প্রতি তীব্র ভালবাসা তৈরি করে দেয়।
4
10
মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি কর্ণাটক রাজ্য সড়ক পরিবহন সংস্থায় বাস কন্ডাক্টরের চাকরি পান। তখন থেকেই শুরু হয় তাঁর আসল মিশন। বেতনের টাকা হাতে পেলেই তিনি সংসারের খরচ বাঁচিয়ে সোজা চলে যেতেন বইয়ের দোকানে। একটা একটা করে বই কিনতে শুরু করেন তিনি।
5
10
চাকরি করার পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং কন্নড় সাহিত্যে এমএ পাস করেন। এরপর একটি চিনির কারখানায় প্রায় ৩০ বছর টাইমকিপার হিসেবে কাজ করেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি তাঁর মাইনের প্রায় ৮০ শতাংশ টাকাই খরচ করে ফেলতেন বই কিনতে।
6
10
ধীরে ধীরে বইয়ের সংখ্যা এত বেড়ে যায় যে ঘরে আর তিল ধারণের জায়গা ছিল না। ট্রাঙ্ক উপচে বই বারান্দায় চলে আসে। বইগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে এবং মানুষের পড়ার ব্যবস্থা করতে অঙ্কে গৌড়া এক অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মহীশূরে নিজের সাধের আস্ত বাড়িটি বিক্রি করে দেন! সেই টাকা দিয়ে মাণ্ড্য জেলার হারালাহল্লি গ্রামে তৈরি করেন তাঁর স্বপ্নের লাইব্রেরি, যার নাম দিয়েছেন ‘পুস্তক মানে’ (কন্নড় ভাষায় যার অর্থ ‘বই ঘর’)।
7
10
কী আছে এই ‘বই ঘরে’? আজ প্রায় ১৫,৮০০ বর্গফুট জায়গার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে তাঁর এই লাইব্রেরি। এখানে কন্নড়, ইংরেজি, হিন্দি, তামিল, তেলুগুসহ প্রায় ২০টিরও বেশি ভাষার ২০ লাখের ওপর বই রয়েছে। অঙ্কে গৌড়ার গল্প, উপন্যাস, কবিতার পাশাপাশি বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল ও পুরাণের ওপর প্রচুর বই রয়েছে। একইসঙ্গে রয়েছে ১৮৩২ সালের অত্যন্ত প্রাচীন কিছু পাণ্ডুলিপি, ৫ হাজারেরও বেশি বিরল ডিকশনারি বা অভিধান, মহাত্মা গান্ধী এবং ভগবদ গীতার ওপর দেশ-বিদেশের হাজার হাজার বই এখানে সাজানো আছে।
8
10
এই লাইব্রেরিতে আসার জন্য বা বই পড়ার জন্য একটা টাকাও দিতে হয় না। স্কুল-কলেজের পড়ুয়া, বড় বড় গবেষক থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, সকলের জন্য এই লাইব্রেরির দরজা চব্বিশ ঘণ্টা খোলা এবং একদম বিনামূল্যে।
9
10
৭৫ বছর বয়সেও অঙ্কে গৌড়া নিজে হাতে প্রতিদিন হাজার হাজার বইয়ের ধুলো ঝাড়েন, সেগুলোকে গুছিয়ে রাখেন। লাইব্রেরির বইয়ের যাতে কোনও ক্ষতি না হয়, তাই তিনি এবং তাঁর স্ত্রী বিজয়লক্ষ্মী নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে ওই লাইব্রেরি ভবনেরই এক কোণে মেঝেতে চাদর পেতে ঘুমান। সেখানেই ছোট একটা উনুনে রান্না করে কোনোমতে জীবন কেটে যায় তাঁদের। বর্তমানে তাঁর ছেলে সাগর এই বইগুলোকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সাজানোর কাজে বাবাকে সাহায্য করছেন।
10
10
পদ্মশ্রী পুরস্কার পাওয়ার পর অত্যন্ত বিনয়ী অঙ্কে গৌড়া বলেন, "আমি কোনোদিন পুরস্কারের লোভ করিনি। গত ৫০ বছর ধরে স্রেফ নিজের আনন্দের জন্য আর সমাজের জন্য এই কাজ করে গেছি। আমি চাই, অভাবের জন্য যেন কোনও বাচ্চার পড়াশোনা আটকে না থাকে।"