কালো চশমায় সেলিম, জোটের অন্ধকারে কি দেখা মিলবে আলোর?
নিজস্ব সংবাদদাতা
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪ : ৫৯
শেয়ার করুন
1
9
বাংলার বিধানসভা নির্বাচনের আর বেশি দেরি নেই। অথচ বামফ্রন্ট কাদের সঙ্গে জোট করবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এই অনিশ্চয়তার আবহেই জল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ করলেন মহম্মদ সেলিম। তিনি জানালেন, আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠক এবং ১৯-২০ ফেব্রুয়ারি রাজ্য কমিটির বৈঠকের পরই আসন সমঝোতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে।
2
9
দীর্ঘদিন ধরেই সিপিআই(এম) রাজ্য নেতৃত্ব বিজেপি ও তৃণমূল-বিরোধী সমস্ত শক্তিকে এক ছাতার তলায় আনার কথা বলে আসছে। কিন্তু বাস্তবে সেই জোটের অঙ্ক মেলানো সহজ হচ্ছে না। ইতিমধ্যেই কংগ্রেস স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা রাজ্যের ২৯৪টি আসনেই একা প্রার্থী দেবে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্টের সঙ্গে জোট করেও একটি আসন না পাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে কংগ্রেস নেতৃত্বের দাবি—মাঠপর্যায়ে জোট কার্যকর হয়নি, বরং তৃণমূল-বিজেপি মেরুকরণের মাঝে তাদের সংগঠন দুর্বল হয়েছে।
3
9
বাংলার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিসংখ্যানও বামেদের সামনে কঠিন বাস্তব তুলে ধরছে। ২০০৯ সালে সিপিআই(এম)-এর ভোট শতাংশ ছিল ৩৩.১। তা কমে ২০১৯ সালে দাঁড়ায় ৬.৩ শতাংশে এবং ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে আরও নেমে ৫.৭ শতাংশে পৌঁছয়। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সিপিএম-এর কোনও বিধায়ক নেই, লোকসভাতেও নেই কোনও সাংসদ। গত ১৪ বছরে তৃণমূলের কাছে হারানো রাজনৈতিক জমি জোট করেও ফেরত আসেনি—এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
4
9
আসন সমঝোতা প্রসঙ্গে সেলিমের মুখে আইএসএফের নাম উচ্চারিত হওয়ায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২১ সালে আইএসএফের সঙ্গে জোট করে বামফ্রন্ট একটি মাত্র বিধায়ক পেয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা সুখকর না হলেও, এবারে কি ফের সেই পথে হাঁটতে চলেছে বামেরা? যদিও এ বিষয়ে সেলিম স্পষ্ট কিছু বলেননি, তবে “বিজেপি ও তৃণমূল বিরোধী দলগুলির সঙ্গে আলোচনা চলছে”—এই মন্তব্যেই জল্পনা আরও ঘনীভূত হয়েছে।
5
9
তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত বিধায়ক হুমায়ূন কবীর-এর সঙ্গে সেলিমের বৈঠক নিয়েও বিতর্ক কম হয়নি। ফরওয়ার্ড ব্লক ও আরএসপি-র মতো বামফ্রন্ট শরিকরা এই বৈঠক নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। ফ্রন্টের বৈঠকে এ নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা হয়েছে বলেও জানা গেছে। যদিও সেলিমের দাবি, এই বৈঠক ছিল কেবলমাত্র কবীরের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা জানার জন্য। অন্যদিকে হুমায়ূন কবীরের বক্তব্য আরও সরাসরি। তাঁর কথায়, “আমি ৩০ বছর কংগ্রেসে ছিলাম। তাদের বর্তমান সিদ্ধান্ত তৃণমূলের কাছে আত্মসমর্পণের শামিল। যারা বিজেপিকে দূরে রাখতে ও তৃণমূলের বিরোধিতা করতে চায়, তাদের এক ছাতার তলায় আসা উচিত। AIMIM-সহ কোনও দলই অচ্ছুত নয়।”
6
9
এই প্রেক্ষাপটে All India Majlis-e-Ittehadul Muslimeen (AIMIM)-এর ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে। হায়দরাবাদের সাংসদ আসাদউদ্দিন ওয়াইসি-র দল ২০২০ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে পাঁচটি আসন জিতে মুসলিম ভোট ভাগ করে বিজেপিকে সুবিধা করে দেওয়ার অভিযোগের মুখে পড়েছিল। ২০২১ সালে বাংলাতেও লড়াইয়ের ঘোষণা করলেও, পরে সংগঠনিক ভাঙনের মুখে পড়ে তাদের বঙ্গ ইউনিট। সাম্প্রতিক সময়ে AIMIM-এর বঙ্গ ইউনিটের তরফে একাধিক দলের সঙ্গে যোগাযোগের কথা জানানো হয়েছে। যদিও সেলিম AIMIM-এর সঙ্গে যোগাযোগের জল্পনাকে ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। সিপিএম সূত্রে দাবি, বিজেপির তরফে ইচ্ছাকৃতভাবে এই কানাঘুষো ছড়ানো হচ্ছে।
7
9
এদিকে কলকাতায় এসে দলীয় কর্মসূচিতে যোগ দেন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক মারিয়াম আলেকজান্ডার বেবি। সাংবাদিক বৈঠকে সেলিমের পাশে বসে তিনি কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেন। সদ্য ছানি অস্ত্রোপচার হওয়ায় কালো চশমা পরে বৈঠকে হাজির হন সেলিম। সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তাঁর হালকা কটাক্ষ—“আমাদের তো ব্র্যান্ডের চশমা নয়”—রাজনৈতিক উত্তাপের মাঝে খানিক হাসির রসদ জুগিয়েছে।
8
9
রাজনৈতিক প্রস্তুতির পাশাপাশি জনমত সংগ্রহে জোর দিচ্ছে সিপিএম। ‘বাংলা বাঁচাও ডট কম’ নামে একটি ওয়েবসাইটের উদ্বোধন করেন এম এ বেবি। সেখানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিল্পায়ন, পরিবেশ ও নারী সুরক্ষা—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নাগরিকদের মতামত চাওয়া হয়েছে। “আপনার পরামর্শ জমা দিন”—এই আহ্বান জানিয়ে দল বিকল্প উন্নয়ন রূপরেখা তৈরির কথা বলছে। ওয়েবসাইটে কিউআর কোড স্ক্যান করলেই নির্দিষ্ট ইস্যুতে মতামত জানানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
9
9
সব মিলিয়ে, বাংলার রাজনীতিতে জোটের অঙ্ক এখনও অনিশ্চিত। কংগ্রেস একা লড়ার ঘোষণা দিয়েছে। আইএসএফ, AIMIM কিংবা হুমায়ূন কবীরের সম্ভাব্য রাজনৈতিক মঞ্চ—কার সঙ্গে শেষ পর্যন্ত আসন সমঝোতা হবে, তা স্পষ্ট হবে ১৮ ফেব্রুয়ারির বৈঠকের পর। ভোটের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বামফ্রন্টের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—জোটের সমীকরণ কি তাদের হারানো জমি ফিরিয়ে আনতে পারবে, নাকি নতুন পরীক্ষার মুখে পড়বে বাংলার বাম রাজনীতি? রাজনৈতিক মহলের চোখ এখন সেই ঘোষণার দিকেই।