পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আঁচ এবার সরাসরি এসে পড়ল সাধারণ ভারতীয়দের রান্নাঘরে। ইরান-ইজরায়েল সংঘাতের জেরে গত ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে সরবরাহ ব্যবস্থায় যে টান পড়েছে, তার ফল ভুগছেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে দিল্লি পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ পরিবার। কোথাও সিলিন্ডার পেতে ১০ থেকে ২০ দিন দেরি হচ্ছে, আবার কোথাও আকাশছোঁয়া দামে কালোবাজারে বিকোচ্ছে রান্নার গ্যাস। পরিস্থিতির চাপে অনেক গরিব পরিবার গ্যাসের আশা ছেড়ে ফের পুরনো আমলের মাটির উনুন আর কাঠ-কয়লায় ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
2
9
রাজধানী দিল্লির কথাই ধরা যাক। মধ্যবিত্ত ও পরিযায়ী শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে হাহাকার সবথেকে বেশি। করোল বাগের অক্ষয় দুবের মতো বহু মানুষ বিপাকে পড়েছেন বাড়ির কোনও বড় সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজনে। ৪০০ লোকের ভোজের জন্য গ্যাসের সংস্থান করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত কয়লার উনুনেই রান্না সারার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
3
9
দিল্লির অনেক এলাকায় আগে যেখানে বুকিংয়ের দু-দিনের মধ্যে গ্যাস চলে আসত, এখন সেখানে ন-দশ দিন অপেক্ষা করাটাও ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকটের মূল কারণ হল হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা, যেখান দিয়ে ভারতের আমদানিকৃত এলপিজির প্রায় ৯০ শতাংশ যাতায়াত করে। যুদ্ধের ফলে সরবরাহ কমে যাওয়ায় সরবরাহকারী সংস্থাগুলো হিমশিম খাচ্ছে।
4
9
পশ্চিমবঙ্গের চিত্রটাও খুব একটা আলাদা নয়। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকা যেমন হাওড়া বা নিউ ব্যারাকপুরেও গ্যাসের ডেলিভারি পেতে স্বাভাবিকের চেয়ে সপ্তাহখানেক বেশি সময় লাগছে। কেউ কেউ অনলাইনে বুকিং করতে পারলেও ফোন হাতে বসে থাকছেন মেসেজের অপেক্ষায়। অদ্ভুত ব্যাপার হল, অনেক গ্রাহক আবার অভিযোগ করছেন যে সিলিন্ডার বাড়ি না পৌঁছালেও তাদের কাছে ডেলিভারি সফল হওয়ার ভুয়া মেসেজ চলে আসছে।
5
9
এর পেছনে কোনো অসাধু চক্র বা কালোবাজারির হাত থাকতে পারে বলে সাধারণ মানুষের আশঙ্কা। অন্যদিকে, উত্তরপ্রদেশের আগ্রার মতো জায়গায় পরিস্থিতি আরও জটিল; সেখানে একেকটি সিলিন্ডারের জন্য ২০ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে, আর কালোবাজারে এক-একটি সিলিন্ডারের দাম হাঁকা হচ্ছে দুই হাজার টাকারও বেশি।
6
9
দক্ষিণের রাজ্যগুলোতেও ছবিটা মিশ্র। কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুতে অনেক পরিবার ২৫ দিন ধরে অপেক্ষা করেও সিলিন্ডার পাচ্ছে না। ম্যাঙ্গালুরুতে আবার সেই অপেক্ষার সময় দাঁড়িয়েছে ৩০ থেকে ৪৫ দিন। এই সংকটে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন ছোট হোটেল আর রাস্তার ধারের ধাবার মালিকরা।
7
9
বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের জোগান প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু দোকান সাময়িকভাবে ঝাঁপ ফেলে দিয়েছে, অথবা কাঠ-কয়লায় রান্না চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে বিহার ও ঝাড়খণ্ডের মতো রাজ্যে পরিস্থিতির চাপ এতটাই যে, কেন্দ্রীয় সরকারের উজ্জ্বল যোজনার আওতায় আসা অনেক গ্রাহক আবার গোবর ও ঘুটের উনুনে ফিরে গেছেন, কারণ কালোবাজারের চড়া দামে গ্যাস কেনা তাঁদের সাধ্যের অতীত।
8
9
গুজরাট বা মুম্বইয়ের মতো যে সব শহরে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস (PNG) সরবরাহ করা হয়, সেখানে ভোগান্তি কিছুটা কম। কিন্তু ভারতের সিংহভাগ মানুষ যারা এখনও এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই যুদ্ধের রেশ কাটছে না। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ গড়াতে চললেও সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কোনও নির্দিষ্ট আশ্বাস নেই।
9
9
সরকার বুকিংয়ের নিয়ম অপরিবর্তিত রাখলেও মাঠপর্যায়ে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড়সড় ফারাক রয়ে গেছে। সব মিলিয়ে, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে কত গোলা বারুদ ফাটছে তার হিসেব না মিললেও, সাধারণ মানুষের হেঁশেলের আগুন জ্বালানো যে দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে, তা বলাই বাহুল্য।