শক্তিপীঠ কামাখ্যায় নেই কোনও মূর্তি, কেন বন্ধ থাকে মন্দির? দর্শন না পেয়েও কেন অম্বুবাচীতে ভক্তরা ভিড় করেন?
নিজস্ব সংবাদদাতা
২৩ জুন ২০২৬ ১৭ : ১৭
শেয়ার করুন
1
13
অসমের রাজধানী গুয়াহাটির পশ্চিমাংশে অবস্থিত নীলাচল পাহাড়ের কোলে অবস্থিত কামাখ্যা মন্দির। দেবী মহামায়া এই মন্দিরে কামাখ্যারূপে বিরাজমান। কামাখ্যা তীর্থক্ষেত্র ৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম।
2
13
কথিত আছে, শিবপত্নী সতীর দেহত্যাগের পর, বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে সতীর দেহ খণ্ডিত হয়ে বিভিন্ন স্থানে পড়ে। এর মধ্যে নীলাচল পাহাড়ে দেবীর 'যোনি' পতিত হয়৷ হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, কামাখ্যা মন্দিরে দেবী সতীর গর্ভ এবং যোনি পড়েছিল। সেকারণেই দেবী কামাখ্যাকে ঊর্বরতার দেবী বা "রক্তক্ষরণকারী দেবী" বলা হয়।
3
13
মন্দিরে নেই কোনও মূর্তি। শুধু একটি পাথরের সরু গর্ত দেখা যায়। গর্ভগৃহটি ছোটো এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন। সরু খাড়াই সিঁড়ি পেরিয়ে এখানে পৌঁছাতে হয়। ভিতরে ঢালু পাথরের একটি খণ্ড আছে। সেটি যোনির আকৃতি বিশিষ্ট। এটিতে প্রায় দশ ইঞ্চি গভীর একটি গর্ত দেখা যায়।
4
13
হিন্দু পুরাণ অনুসারে, রাজা দক্ষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মহাদেবকে বিয়ে করেছিলেন তাঁর কন্যা সতী। মহাদেবের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য দক্ষ রাজা বৃহস্পতি নামে এক যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। যজ্ঞে সতী কিংবা মহাদেব কাউকেই আমন্ত্রণ জানাননি দক্ষ।
5
13
মহাদেবের অনিচ্ছা সত্ত্বেও সতী বাবার আয়োজিত যজ্ঞানুষ্ঠানে যান। সেখানে দক্ষ মহাদেবকে অপমান করেন। স্বামীর অপমান সহ্য করতে না পেরে সতী দেহত্যাগ করেন। শোকাহত মহাদেব দক্ষর যজ্ঞ ভণ্ডুল করেন এবং দেবী সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রলয় নৃত্য শুরু করেন।
6
13
তাঁর তাণ্ডব বন্ধ করতে অন্যান্য দেবতাদের অনুরোধে বিষ্ণুদেব তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর মৃতদেহ ছেদন করেন। এতে সতীর দেহখণ্ডসমূহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন জায়গায় পড়ে এবং পবিত্র পীঠস্থান শক্তিপীঠ বা সতীপীঠ নামে পরিচিতি। কামাখ্যা সেই শক্তিপীঠের অন্যতম।
7
13
একটি ভূগর্ভস্থ প্রস্রবনের জল বেরিয়ে এই গর্তটি সবসময় ভর্তি রাখে। এই গর্তটিই দেবী কামাখ্যা নামে পূজিত এবং দেবীর পীঠ হিসেবে প্রসিদ্ধ। কামাখ্যা মন্দির চত্বরের অন্যান্য মন্দিরগুলিতেই একই রকম যোনি-আকৃতিবিশিষ্ট পাথর দেখা যায়, যা ভূগর্ভস্থ প্রস্রবনের জল দ্বারা পূর্ণ থাকে।
8
13
আষাঢ় মাসে মৃগশিরা নক্ষত্রের তিনটি পদ শেষ হলে পৃথিবী বা ধরিত্রী মা ঋতুময়ী হয়। এই সময়টিতে অম্বুবাচী পালন করা হয়। অম্বুবাচীর দিন থেকে মোট তিনদিন দেবী কামাক্ষ্যার মন্দির বন্ধ থাকে। শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময়ে দেবী কামাখ্যা ঋতুমতী হন, অর্থাৎ দেবীর বার্ষিক ঋতুচক্রের সময় শুরু হয়। তাই এই কয়েকদিন দেবীকে বিশ্রাম দেওয়া হয় এবং মন্দিরের গর্ভগৃহ সাধারণ ভক্তদের জন্য বন্ধ রাখা হয়।
9
13
সেই তিনদিন কোনও মাঙ্গলিক কাজ করা যায় না। এই তিনদিন দেবী দর্শনও নিষিদ্ধ থাকে। চতুর্থ দিন দেবীর স্নান এবং পূজা সম্পূর্ণ হওয়ার পর মন্দিরে দেবী মূর্তি দর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়।
উপস্থিত হন লক্ষ লক্ষ ভক্ত। কামাখ্যা মন্দিরের চারদিকে চলে নাম সংকীর্তন। অম্বুবাচীর শেষ দিন ভক্তদের রক্তবস্ত্র উপহার দেওয়া হয়। দেবীপীঠের সেই রক্তবস্ত্র ধারণ করলে মনোকামনা পূর্ণ হয় বলে বিশ্বাস করেন ভক্তরা।
10
13
কামাখ্যা মন্দিরের চারটি প্রধান কক্ষ। গর্ভগৃহ এবং তিনটি মণ্ডপ (চলন্ত, পঞ্চরত্ন এবং নাটমন্দির)। মূল মন্দিরের পাশাপাশি রয়েছে মহাকালী, তারা, ষোড়শী বা ললিতাম্বা ত্রিপুরেসুন্দরী, ভুবনেশ্বরী বা জগদ্ধাত্রী,কামাখ্যা, শৈলকন্যা, ব্রক্ষচারিণী বা তপস্যারিণী, মঙ্গলচন্ডী, কুষ্মাণ্ডা, মহাগৌরী, চামুণ্ডা,কৌষিকী, দাক্ষায়ণী-সতী, চন্দ্রঘণ্টা, স্বন্দমাতা, কালরাত্রি, কাত্যায়ণী, সিদ্ধিদাত্রী, শাকম্ভরী, হৈমবতী, শীতলা,সংকটনাশিণী,বনচণ্ডী, দেবী দুর্গা, মহাভৈরবী, ধূমাবতী, ছিন্নমস্তা, বগলামুখী, মাতঙ্গী এবং দেবী কমলা– এই ত্রিশ দেবীর মন্দির।
11
13
প্রাচীন যুগ থেকেই আমাদের দেশে নারীকে শক্তি হিসেবে পূজা করা হয়। কামাখ্যা মন্দির তার জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। কালিকা পুরাণ এবং যোগিনী তন্ত্র অনুযায়ী প্রতিটি নারীই শক্তির প্রতীক। এটিই শক্তিবাদের প্রধান কথা।
12
13
অম্বুবাচী শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি তান্ত্রিক সাধনার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধু, তান্ত্রিক ও ভক্তরা এই সময়ে কামাখ্যায় আসেন। মন্দির বন্ধ থাকলেও বাইরে বিশাল অম্বুবাচী মেলা বসে, যেখানে আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, এই সময় দেবীর শক্তি বিশেষভাবে সক্রিয় থাকে।
13
13
অনেকের বিশ্বাস, এই সময় কামাখ্যার পবিত্র ভূমিতে উপস্থিত থাকাও আশীর্বাদ লাভের সমান। তাই সরাসরি দর্শন না হলেও ভক্তরা মন্দির চত্বরে এসে প্রার্থনা, ধ্যান ও সাধনা করেন। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মন্দির খোলার পর যে দর্শন পাওয়া যায়, সেটিও ভক্তদের কাছে পরমপ্রাপ্তি পুণ্যলাভ বলে বিশ্বাস করা হয়৷