পাকিস্তানের গদি কার দখলে থাকবে— প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন নাকি রাওয়ালপিন্ডির সেনা সদর দপ্তর? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই চিরন্তন প্রশ্নের উত্তর বরাবরের মতোই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর পক্ষেই ঝুঁকে থাকে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলী ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পর্দার আড়াল থেকে সুতো টানার পর্ব হয়তো শেষ হতে চলেছে।
2
8
দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভির বিস্ফোরক মন্তব্য— "পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে"— রাজনৈতিক মহলে এক নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে। সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির কি তবে এবার আনুষ্ঠানিকভাবেই দেশের শাসনভার নিজের হাতে তুলে নিতে চলেছেন? গত কয়েক দশক ধরে চলা ‘হাইব্রিড সরকার’ ব্যবস্থা কি তবে নিজের ওজনেই ভেঙে পড়তে চলেছে?
3
8
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে কাছ থেকে দেখেন এমন বিশ্লেষকদের মতে, সে দেশে বর্তমানে প্রত্যক্ষ সেনাশাসন না থাকলেও আসিম মুনিরই বাস্তবে দেশ চালাচ্ছেন। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে বর্ষার প্রস্তুতি, পরমাণু কমান্ডের দেখভাল থেকে শুরু করে তিন সশস্ত্র বাহিনীর অনানুষ্ঠানিক নেতৃত্ব— সব দায়িত্বই এখন তাঁর কাঁধে।
4
8
খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বালুচিস্থানে বাড়তে থাকা বিদ্রোহ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভেঙে পড়া অর্থনীতির মাঝে অসীম মুনির ধীরে ধীরে দেশের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিজের মুঠোয় পুরে নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ স্রেফ এক নামমাত্র মুখপোড়ো হিসেবে রয়ে গেছেন। প্রাক্তন সেনাকর্মী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নেপথ্যে থেকে ক্ষমতা ভোগ করার দিন শেষ হতে চলেছে এবং শীঘ্রই সেনাশাসন জারি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
5
8
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি, যিনি আসিম মুনিরের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং তাঁর বিশ্বস্ত ছায়া হিসেবে পরিচিত। কোনও রাজনৈতিক পটভূমি না থাকা সত্ত্বেও সেনার সমর্থনে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো নকভির মন্তব্যকে কেবল একজন মন্ত্রীর বক্তব্য হিসেবে দেখতে নারাজ বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, নকভি যা বলছেন, তা আদতে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের মনেরই কথা।
6
8
সিনিয়র সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, বর্তমান বেসামরিক ব্যবস্থাকে আরও কোণঠাসা করে পুরোপুরি সেনা শাসনের পথ প্রস্তুত করতেই এই ‘ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার’ তত্ত্ব সামনে আনা হচ্ছে। কিছু সূত্রের দাবি, দেশে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই পাকা করে ফেলেছে রাওয়ালপিন্ডি, যেখানে মুনির রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশ চালাতে পারেন।
7
8
১৯৪৭ সালের পর থেকে একাধিকবার সেনা অভ্যুত্থান দেখেছে পাকিস্তান। ১৯৫৮, ১৯৬৯, ১৯৭৭ বা ১৯৯৯ সালের প্রতিটি অভ্যুত্থানের আগেই বেসামরিক সরকারের ব্যর্থতার গল্প এভাবেই সাজানো হয়েছিল। তবে বর্তমানে যে ‘সফট ক্যু’ বা পরোক্ষ সেনাশাসন চলছিল, তা দিয়েও অর্থনৈতিক সংকট ও জনগণের ক্ষোভ সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
8
8
যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে মার্শাল ল জারি করা হবে নাকি নতুন কোনও পুতুল সরকার বসিয়ে কাজ চালানো হবে, তা সময় বলবে; তবে এ কথা স্পষ্ট যে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব এখন সব জবাবদিহিতা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। আর এই পরীক্ষা যদি ব্যর্থ হয়, তবে দায় চাপানোর জন্য কোনও বেসামরিক রাজনীতিবিদের মুখও অবশিষ্ট থাকবে না।