শত্রুপক্ষের রেডার যদি কখনও ভারতীয় যুদ্ধবিমানকে নিশানা করে ফেলে, ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের মাঝে আচমকা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে পড়বে অন্য একটি বিমান। শত্রুর মিসাইল নিজের গায়ে টেনে নেবে, কিন্তু ভারতীয় পাইলটের প্রাণের কোনও ক্ষতি হতে দেবে না। আর আকাশযুদ্ধে গোলাগুলি ফুরিয়ে গেলে স্বয়ংক্রিয় কামিকাজে বা আত্মঘাতী ড্রোনের মতোই আছড়ে পড়বে বিপক্ষের ঘাঁটিতে।
2
9
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চালিত ড্রোন থাকতে এমন রণকৌশলের প্রয়োজন কেন—এই কৌতূহলের মাঝেই সম্পূর্ণ চালকবিহীন এমন এক অত্যাধুনিক কমব্যাট এয়ারক্র্যাফটের নকশা সামনে আনল বেঙ্গালুরুর প্রতিরক্ষা স্টার্টআপ ‘ফ্লাইং ওয়েজ ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস’ (FWDA)।
3
9
‘এফডব্লিউডি সুপ্রিম’ (FWD Supreme) নামের এই এআই-পাইলটেড ফাইটার জেটের আত্মপ্রকাশের হাত ধরে আমেরিকা, জার্মানি কিংবা তুরস্কের মতো চালকবিহীন সামরিক প্রযুক্তির এলিট ক্লাবে ভারতের নাম আরও জোরদার হলো।
4
9
যুদ্ধের আকাশ অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠলে রক্তমাংসের পাইলটকে সরাসরি বিপদের মুখে না ঠেলে প্রথমে পাঠানো হবে এই এআই পরিচালিত ই-পাইলটকে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে শত্রুকে চিহ্নিত করা, গতিপথ নির্ধারণ এবং নিখুঁত লক্ষ্যে মিসাইল হামলা চালানো—সবই ঘটবে মানুষের শারীরিক উপস্থিতি ছাড়া। এই প্রকল্পের মূল চালিকাশক্তি জীবজগতের আচরণ থেকে ধার করা এক বিশেষ রণকৌশল, যার নাম ‘মবিং ডকট্রিন’ (Mobbing Doctrine)।
5
9
অর্থাৎ, ঠিক যেভাবে বন্যপ্রাণীরা দলবেঁধে ঝাঁক বেঁধে অনেক বড় শিকারিকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে পরাস্ত করে, ঠিক তেমনই আকাশে শত্রুর ভারী ও মূল্যবান যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে ঝাঁকে ঝাঁকে ডানা মেলবে তুলনামূলক কম খরচের এই স্বয়ংক্রিয় ফাইটার জেটগুলি। অসম এই যুদ্ধে চার-পাঁচটি চালকহীন বিমান ধ্বংস হলেও শত্রুর মূল বিমান পিছু হটতে বাধ্য হবে, আর রক্ষা পাবে আকাশসীমা ও সেনার বহুমূল্য প্রাণ।
6
9
পুরো প্রকল্পটি মূলত দুটি ধাপে রূপায়িত হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে তৈরি হয়েছে ২৫০ কেজির টেকনোলজি ডেমনস্ট্রেটর ‘এফডব্লিউডি সুপ্রিম লাইট’। মাখ ০.৯ পর্যন্ত গতিবেগ এবং ৭০০ থেকে ১,০০০ কিলোমিটার অপারেশনাল রেঞ্জের এই যানটির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন, বিপদ শনাক্তকরণ এবং অন্য ড্রোনগুলোর সঙ্গে যৌথ সমন্বয়ের ক্ষমতা যাচাই করা হবে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে চলতি বছরের তৃতীয় ত্রৈমাসিক শেষ হওয়ার আগেই এটি আকাশে উড়বে।
7
9
আর এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হল এক টন ওজনের ‘এফডব্লিউডি সুপ্রিম হেভি’ তৈরি করা, যা নিখুঁত স্ট্রাইক এবং নজরদারির কাজ করবে সম্পূর্ণ জ্যামিং-প্রতিরোধী প্রযুক্তি নিয়ে। মাটি থেকে দূরনিয়ন্ত্রিত ড্রোনের মতো কোনও অবিচ্ছিন্ন ডেটা লিঙ্কের ওপর এটি নির্ভর করবে না, ফলে শত্রু সিগন্যাল জ্যাম করলেও এর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় কোনও বাধা পড়বে না।
8
9
এই উদ্যোগটি নিছক কোনও কাগুজে পরিকল্পনা নয়, কারণ এই স্টার্টআপটির নেতৃত্বে রয়েছেন ভারতের দেশীয় যুদ্ধবিমান ‘তেজস’ তৈরির নেপথ্যের অভিজ্ঞ কাণ্ডারিরা। হ্যাল তেজস প্রস্তুতকারী অ্যারোনটিক্যাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সির (ADA) প্রাক্তন সচিব গিরিশ দীক্ষিত এবং লাইট কমব্যাট এয়ারক্রাফট প্রকল্পের প্রাক্তন ডিরেক্টর ভি সুব্বা রাও সহ দেশের পোড়খাওয়া অ্যারোস্পেস বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন এই পরিকল্পনার পেছনে।
9
9
বিশ্বজুড়ে আমেরিকার ‘ভ্যালকিরি’ বা অস্ট্রেলিয়ার ‘গোস্ট ব্যাট’-এর মতো কোল্যাবরেটিভ কমব্যাট এয়ারক্রাফটের দৌড় যখন তুঙ্গে, এবং ভারতের সরকারি সংস্থা হ্যাল যখন তাদের নিজস্ব ক্যাটস (CATS) সিস্টেম নিয়ে এগোচ্ছে, তখন দেশের বেসরকারি ক্ষেত্র থেকে এমন প্রযুক্তির আত্মপ্রকাশ ভারতের বিমান প্রতিরক্ষায় এক যুগান্তকারী ও সাহসী পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।