স্বাধীনতা দিবসে যখনই ভারতের ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা উত্তোলিত হয়, তখন লক্ষ লক্ষ মানুষ গর্বের সঙ্গে এর গেরুয়া, সাদা ও সবুজ রঙের দিকে তাকান। অথচ যে মানুষটির দূরদর্শী চিন্তাভাবনা ভারতকে এই চিরস্থায়ী প্রতীকটি উপহার দিয়েছিল, তিনি জাতীয় পাদপ্রদীপের আলো থেকে অনেকটাই আড়ালে রয়ে গিয়েছেন। অন্ধ্রপ্রদেশের এক স্বাধীনতা সংগ্রামী ও দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া বছরের পর বছর ধরে ভেবেছিলেন ভারতীয় পতাকার তাৎপর্য কী হওয়া উচিত। দেশ স্বাধীন হওয়ার অনেক আগে থেকেই তিনি এই ধারণাটি বাস্তবায়নের জন্য ক্রমাগত প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন।
2
8
১৮৭৯ সালের ২রা আগস্ট অন্ধ্রপ্রদেশে জন্মগ্রহণকারী ভেঙ্কাইয়া তাঁর অদম্য কৌতূহল ও জ্ঞানপিপাসার জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁর জীবনযাত্রার পথ তাঁকে নিজ জন্মভূমির সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূরে নিয়ে গিয়েছিল। এমনকি তিনি কেমব্রিজেও পড়াশোনা করেছিলেন। যৌবনে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় 'বোয়ার যুদ্ধ'-এ অংশ নিয়েছিলেন, যেখানে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। সেই সাক্ষাৎ ভারতের স্বাধীনতা ও জাতীয় পরিচিতি বিষয়ক তাঁর চিন্তাধারায় গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল।
3
8
ব্রিটিশ শাসনের প্রতীকগুলো প্রত্যক্ষ করার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় পতাকার ধারণাটি ভেঙ্কাইয়ার মনে আরও জোরালো হয়ে ওঠে। কংগ্রেসের এক সমাবেশে 'ইউনিয়ন জ্যাক' (ব্রিটিশ পতাকা) উড়তে দেখে তিনি ব্যথিত হয়েছিলেন বলে জানা যায়। তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল, যে শক্তির কবল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ভারতীয়রা লড়াই করছে, তাদেরই পতাকাকে কেন অভিবাদন জানাতে হবে? তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, স্বাধীনতা আন্দোলনের নিজস্ব একটি প্রতীক থাকা প্রয়োজন। তখন থেকেই জাতীয় পতাকার নকশা তৈরি করা কেবল একটি আগ্রহের বিষয় নয়, বরং একটি ব্রত বা মিশনে পরিণত হয় তাঁর।
4
8
ভেঙ্কাইয়া কেবল একটি নকশা এঁকেই থেমে থাকেননি। ১৯১৬ থেকে ১৯২১ সালের মধ্যে তিনি প্রায় ৩০টি দেশের পতাকা নিয়ে বিশদ পড়াশোনা করেন এবং বোঝার চেষ্টা করেন কীভাবে বিভিন্ন রঙ ও প্রতীক কোনও জাতির পরিচিতি তুলে ধরতে পারে। তাঁর এই গবেষণালব্ধ চিন্তাভাবনা শেষ পর্যন্ত 'আ ন্যাশনাল ফ্ল্যাগ ফর ইন্ডিয়া' নামক একটি পুস্তিকার রূপ নেয়। সেখানে ভারতীয় জাতীয় পতাকার জন্য বিভিন্ন ধারণা উপস্থাপন করা হয়েছিল। তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বিভিন্ন অধিবেশনে তাঁর প্রস্তাবগুলো তুলে ধরতে থাকেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল এই ধারণাটিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যাতে তা আর উপেক্ষা করা না যায়।
5
8
তাঁর এই নিরলস প্রচেষ্টার ফলে ১৯২১ সালে এই বিষয়ে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে সরাসরি আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়। বিভিন্ন তথ্যসূত্র অনুযায়ী, গান্ধী স্মরণ করেছিলেন যে বেজওয়াড়ায় তিনি ভেঙ্কাইয়াকে লাল ও সবুজ পটভূমির ওপর একটি চরকার ছবি-সহ নকশা তৈরি করতে বলেছিলেন। পরবর্তীতে গান্ধীর মনে হয় যে নকশাটিতে ভারতের বৃহত্তর ধর্মীয় বৈচিত্র্যের প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। তাই তিনি সবুজ ও লালের পাশাপাশি সাদা পটভূমি ব্যবহারের পরামর্শ দেন। গান্ধীর বর্ণনা অনুযায়ী, ভেঙ্কাইয়া মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই পতাকাটি প্রস্তুত করে ফেলেছিলেন।
6
8
শুরুর দিকের সংস্করণটি ঠিক আজকের পরিচিত ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকার মতো ছিল না। ভারত যখন শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা লাভ করে, তখন পতাকাটিতে আরও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়। ১৯৪৭ সালের ২২শে জুলাই, গণপরিষদ পতাকাটির বর্তমান রূপটি গ্রহণ করে। এতে মূল ত্রিবর্ণরঞ্জিত ধারণাকে অক্ষুণ্ণ রাখা হলেও চরকার পরিবর্তে অশোক চক্র যুক্ত করা হয়। এই চক্রটি আইন, ন্যায়পরায়ণতা ও অগ্রগতির আদর্শকে তুলে ধরে এবং পতাকাটিকে এমন এক প্রতীকী তাৎপর্য প্রদান করে যা নবগঠিত স্বাধীন প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম।
7
8
তবে, যে জাতীয় প্রতীকটি গড়ে তুলতে ভেঙ্কাইয়া সহায়তা করেছিলেন, তা যতটা ব্যাপক পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, তিনি নিজে ততটা পরিচিতি পাননি। তাঁর কাহিনীটি রাতারাতি খ্যাতি অর্জনের নয়, বরং দীর্ঘ অধ্যবসায়ের গল্প। এমন এক ব্যক্তির কাহিনী যিনি বছরের পর বছর ধরে পতাকা নিয়ে গবেষণা করেছেন, নিজের ধারণাকে পরিমার্জিত করেছেন এবং ভারতীয় পতাকার প্রয়োজনীয়তার কথা বারবার তুলে ধরেছেন।
8
8
আজ যখন ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকাটি উত্তোলন করা হয়, তখন এর গেরুয়া, সাদা ও সবুজ রঙ এবং অশোক চক্র বিশ্বজুড়ে সহজেই সবার চোখে পড়ে। সেই পরিচিত দৃশ্যটির আড়ালে লুকিয়ে আছে পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়ার প্রায় বিস্মৃত এক কাহিনী, সেই মানুষটির কথা, যিনিই প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন যে স্বাধীন ভারতের জন্য নিজস্ব একটি পতাকা থাকা প্রয়োজন।