বঙ্গোপসাগরে অতি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ তৈরি হওয়ার ঘটনা ফের নজর কেড়েছে আবহাওয়াবিদদের। বর্ষা বিদায়ের পর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর উত্তর ভারত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড় তৈরির অন্যতম সক্রিয় সময়। এই সময় সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের পরিস্থিতি ঝড় তৈরির অনুকূলে থাকে।
2
11
ঘূর্ণিঝড়ের শক্তির অন্যতম উৎস উষ্ণ সমুদ্রের জল। সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অন্তত ২৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং প্রায় ৫০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত উষ্ণ জল থাকলে ঝড় তৈরির অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সমুদ্রের জল থেকে তাপ ও জলীয় বাষ্প সংগ্রহ করে শক্তি বাড়ায় ঘূর্ণিঝড়।
3
11
বর্ষায় প্রবল বৃষ্টি এবং গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের মতো নদীর জল বঙ্গোপসাগরে মেশে। এর ফলে সমুদ্রের উপরিভাগে তুলনামূলক কম লবণাক্ত জলের একটি স্তর তৈরি হয়। এই স্তর নীচের অপেক্ষাকৃত বেশি লবণাক্ত জলের সঙ্গে সহজে মিশতে চায় না। ফলে সমুদ্রের উপরিভাগের তাপ ধরে রাখার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
4
11
সমুদ্রের উপর কোনও অঞ্চলে বায়ুর চাপ কমতে শুরু করলে আশপাশের বাতাস সেই নিম্নচাপের দিকে ছুটে আসে। পৃথিবীর ঘূর্ণনের প্রভাবে বাতাস পাক খেতে থাকে। উষ্ণ জল থেকে উঠে আসা আর্দ্র বাতাস উপরে ঠান্ডা হয়ে মেঘ ও বৃষ্টি তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় তাপ নির্গত হয়ে নিম্নচাপ আরও শক্তিশালী হতে পারে। অনুকূল পরিস্থিতি থাকলে ধীরে ধীরে তৈরি হয় ঘূর্ণিঝড়।
5
11
বর্ষাকালে বায়ুমণ্ডলের নীচের ও উপরের স্তরে বাতাসের গতিবেগ ও দিকের পার্থক্য অনেক সময় বেশি থাকে। একে বলে ‘ভার্টিক্যাল উইন্ড শিয়ার’। বাতাসের এই পার্থক্য তৈরি হতে থাকা ঝড়ের মেঘকে নষ্ট করে দিতে পারে। ফলে অনেক নিম্নচাপ শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার আগেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
6
11
ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আরব সাগরের তুলনায় বঙ্গোপসাগরে প্রায় চার গুণ বেশি ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়। বঙ্গোপসাগরের তুলনামূলক উষ্ণ জল, অনুকূল বায়ুপ্রবাহ এবং প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আসা ঝড়ের অবশিষ্ট অংশ এই পার্থক্যের অন্যতম কারণ। আরব সাগরের জল তুলনামূলক ঠান্ডা হওয়ায় সেখানে ঘূর্ণিঝড় তৈরি ও শক্তিশালী হওয়ার পরিস্থিতি অনেক সময় কম অনুকূল থাকে।
7
11
বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ এবং সংলগ্ন আন্দামান সাগরে অনেক সময় ঘূর্ণিঝড় তৈরির প্রাথমিক পরিস্থিতি দেখা যায়। ক্রান্তীয় অঞ্চলের উপর দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে এগিয়ে চলা বায়ুতরঙ্গের মধ্যে কোথাও কোথাও বায়ুর চাপ কমতে পারে। সেখান থেকেই নিম্নচাপ তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে প্রতিটি নিম্নচাপ যে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হবে, এমন নয়।
8
11
প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিম অংশে তৈরি কিছু শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় বা টাইফুন দক্ষিণ চিন সাগর পেরিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থলভাগের উপর দিয়ে এগিয়ে আসে। স্থলভাগে প্রবেশ করলে উষ্ণ সমুদ্রের জল ও আর্দ্রতার জোগান বন্ধ হওয়ায় ঝড় দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে তার অবশিষ্ট নিম্নচাপ বঙ্গোপসাগরে পৌঁছে অনুকূল পরিবেশ পেলে আবার শক্তিশালী হতে পারে।
9
11
সাধারণত ঘূর্ণিঝড়ের প্রবল বাতাস সমুদ্রের জলকে আলোড়িত করে এবং নীচের ঠান্ডা জল উপরে তুলে আনে। এতে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কমতে পারে, যা ঝড়ের শক্তি বৃদ্ধিতে বাধা দেয়। কিন্তু বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বঙ্গোপসাগরের উষ্ণ জল তুলনামূলক গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। উপরিভাগের কম লবণাক্ত জলের স্তরও জলের মিশ্রণ কমাতে সাহায্য করে। ফলে ঝড়ের মধ্যেও সমুদ্র পর্যাপ্ত তাপ ধরে রাখতে পারে।
10
11
পুণের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ট্রপিক্যাল মেটিওরোলজির গবেষণায় ১৯৮২–২০০০ এবং ২০০১–২০১৯ সালের তথ্যের তুলনায় দেখা গিয়েছে, আরব সাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ৫২ শতাংশ বেড়েছে এবং বঙ্গোপসাগরে ৮ শতাংশ কমেছে। গবেষকেরা আরব সাগরের উপরিভাগের উষ্ণতা বৃদ্ধিকে সেখানে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
11
11
আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর সকালে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ইয়ানাম উপকূলের মধ্যে বাপটলা এবং বিশাখাপত্তনমের মধ্যবর্তী এলাকায় আছড়ে পড়তে পারে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’। উপকূলে আছড়ে পড়ার সময় ঘণ্টায় ১১৫ থেকে ১২৫ কিলোমিটার বেগে ঝড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হাওয়ার সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।