৯১ বছর বয়সেও কাজ বাছাইয়ে অত্যন্ত সচেতন গুলজার। গান, কবিতা, সিনেমা -সব ক্ষেত্রেই যিনি বরাবরই নিজের শর্তে হেঁটেছেন, সেই অস্কারজয়ী প্রবীণ গীতিকার-চিত্রনাট্যকার এবার ফিরছেন ছোটদের ছবির জন্য গান লেখায়। ছোটদের ছবি ‘মাসাব ট্যাঙ্ক’-এ ফের কলম ধরছেন গুলজার, আর এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে তাঁর গভীর আবেগ ও দায়বদ্ধতার অনুভব।
বান্দ্রার নিজের বাড়িতে এক কথোপকথনে গুলজার স্পষ্ট করে জানালেন, ছোটদের জন্য লেখা তাঁর কাছে কোনও শখ বা উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং দায়িত্ব। তাঁর কথায়, “শিশুদের জন্য লেখা মানে শুধু ইচ্ছে নয়, এটা এক ধরনের নৈতিক দায়িত্ব। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই বিষয়টাকে লেখকেরা বরাবরই খুব হালকাভাবে নিয়েছেন।” গুলজার জানান, হায়দরাবাদের মাসাব ট্যাঙ্ক এলাকা, যেখানে ছোটদের খেলার মাঠ কেড়ে নিয়ে সেখানে গজিয়ে উঠেছে বহুতল, এই বাস্তবতা তাঁকে নাড়া দিয়েছে। পরিচালক মেকা রাওয়ের এই প্রকল্প তাঁর হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছে বলেই তিনি যুক্ত হতে রাজি হয়েছেন।
ছোটদের ছবির সঙ্গে গুলজারের সম্পর্ক নতুন নয়। ‘মাসুম’-এর ‘লকড়ি কি কাঠি’ থেকে শুরু করে দ্য জঙ্গল বুক-এর ‘জঙ্গল জঙ্গল পাতা চলা হ্যায়’ ভারতীয় ছোটদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম বড় হয়েছে তাঁর লেখা গানে। সেই প্রসঙ্গে গুলজার বলেন, “আমি শিশুদের জন্য লেখা বন্ধ করব না। যতদিন না আমি আবার নিজে শিশু হয়ে উঠতে পারছি, ততদিন এই লেখালিখি চলবে।” এই বক্তব্যেই ধরা পড়ে তাঁর শিল্পদর্শন।
কন্যা মেঘনা গুলজারের আগামী ছবি ‘দায়রা’-তে কি বাবা-মেয়েকে ফের একসঙ্গে কাজ করতে দেখা যাবে? এই প্রশ্নে গুলজার হালকা হাসিতে জানালেন, আপাতত তা হচ্ছে না। কারণ, করিনা কাপুর খান ও পৃথ্বীরাজ সুকুমারন অভিনীত এই ছবিতে কোনও গান নেই। “মেঘনা নিজেই বলেছে, ‘আমি তোমাকে মিস করব, কিন্তু আমার এই চিত্রনাট্যে গানের জায়গা নেই।’ তাই আমাদের একসঙ্গে কাজ করাটা আপাতত অপেক্ষায় থাকছে,” বলেন তিনি।
নিজের উত্তরাধিকার প্রসঙ্গেও স্পষ্ট গুলজার। তিনি চান তাঁর সন্তানসম সুরকার-পরিচালক বিশাল ভরদ্বাজ শিশুদের জন্য ছবি বানানোর এই ধারা এগিয়ে নিয়ে যান। ‘দ্য ব্লু আমব্রেলা’–র উদাহরণ টেনে গুলজার বলেন, “বিশালের মধ্যে শিশুদের জন্য গান ও গল্প বলার সেই বিশেষ সংবেদনশীলতা রয়েছে।”
পরিবারের মধ্যেও মানবিক বিষয়কে কেন্দ্র করে সৃজনশীল কাজের ধারা অব্যাহত। গুলজার জানান, তাঁর জামাতা গোবিন্দ সাঁধু ইউক্রেন ও গাজার শিশুদের কর্ম দুর্দশা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে একটি বই লিখেছেন। অন্যদিকে মেয়ে মেঘনা লিখেছেন বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের নিয়ে একটি বই।
শুধু লেখালিখিতেই নয়, বাস্তব জীবনেও ছোটদের পাশে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছেন গুলজার। প্রায় চার দশক ধরে তিনি যুক্ত আরুশি নামে বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। ১৯৭২ সালে ‘কোশিশ’ ছবির কাজ করতে গিয়েই এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। গুলজার জানান, গত প্রায় কুড়ি বছর ধরে তিনি প্রতি বছর ওই শিশুদের সঙ্গে শহরের ম্যারাথনে হাঁটেন। “এই শিশুরা প্রশিক্ষণ নিয়ে আজ বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত, নিজেদের প্রতিভা দিয়ে সমাজে জায়গা করে নিচ্ছে,” গর্বের সঙ্গে বলেন তিনি।
৯১ বছরে দাঁড়িয়েও গুলজারের এই ভাবনা স্পষ্ট করে দেয়, তাঁর কাছে শিল্প মানে শুধু সৃষ্টিশীলতা নয়, সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধও। শিশুদের জন্য কলম ধরার এই প্রত্যাবর্তন আসলে সেই দর্শনেরই প্রতিফলন।
